ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি: যুদ্ধবিরতির পর এক দিশাহীন অধ্যায়

ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি: যুদ্ধবিরতির পর এক দিশাহীন অধ্যায়. বাংলা দেহাতি জার্নাল

ভূখণ্ড রক্ষার সংকল্পে দুর্বল কূটনৈতিক প্রতিধ্বনি

বাংলা দেহাতি: 11th May 2025

২০২৫ সালের ১০ মে বিকেল ৩:৩৫ মিনিটে পাকিস্তানের ডিজিএমও মেজর জেনারেল কাশিফ আবদুল্লাহ ভারতের ডিজিএমও জেনারেল রাজীব ঘাই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এবং ৩৬টি দেশের তথাকথিত সমর্থনে বিকেল ৫:০০টায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘোষণা করেন, যদিও ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক বিবৃতিতে তা নিশ্চিত করে। এই ঘোষণা ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়েই এক বিরাট প্রশ্ন তুলে দেয়।

যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শ্রীনগর ও জম্মুতে বিস্ফোরণ ঘটে। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে—ড্রোন হানা, গোলাবর্ষণ, এবং সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ—এগুলি উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তান যথারীতি সব অভিযোগ অস্বীকার করে এবং পাল্টা ভারতের উপর দায় চাপায়। অথচ যুদ্ধবিরতির নির্দেশ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সেনাবাহিনী অবিলম্বে প্রত্যাহার শুরু করে এবং মন্ত্রিসভা স্তব্ধ অবস্থায় থাকে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অমিত শাহ, বা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু—কেউই জাতিকে আশ্বস্ত করার মতো কোনো বিবৃতি দেননি।

চীন, তুর্কি, বাংলাদেশ, এমনকি আইএমএফ পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে। এই একতরফা সমর্থন সত্ত্বেও ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কার্যত নির্বাক ছিল। মোদীর নেতৃত্বে ভারতবর্ষ গত এক দশকে কূটনীতির নামে অসংখ্য বৈদেশিক সফরে অংশ নিলেও—রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন বা ইসরায়েলের নেতানিয়াহু—যাঁরা অতীতে ভারতের পক্ষে সরব ছিলেন, তাঁদের কারোর সঙ্গে ভারতের কোনোরূপ যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি এই সংকটকালে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা ঘোষণাতেই ভারত যেন নিজের কণ্ঠ হারিয়ে বসে।

পাকিস্তান এই সংঘাতে কী অর্জন করল? তারা দাবি করছে—

১. ভারতের উপর সম্পূর্ণ আকাশ আধিপত্য,
২. সামরিক সরঞ্জামের সফল পরীক্ষা,
৩. রাফাল ও SU-30 বিমানের অকার্যকারিতা প্রমাণ,
৪. S-400 প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিক্রম,
৫. ভারতের অভ্যন্তরে একাধিক হামলা,
৬. প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা,
৭. সামরিক কৌশলের নিয়ম পুনর্লিখন।

এইসব দাবি যদি অতিরঞ্জন হয়েও থাকে, ভারত তা একবারও পরাস্ত বা প্রতিহত করতে পারেনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে। বরং, বাংলাদেশের মতো ছোট দেশ যেখানে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সমর্থনে বিবৃতি দেয়, সেখানে ভারতের কোনো সদর্থক কূটনৈতিক প্রত্যুত্তরই অনুপস্থিত।

ভারতের ভিতরে অবস্থাও উদ্বেগজনক। ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত পাকিস্তানকে বিভক্ত করে বিজয় অর্জন করেছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের যুদ্ধবিরতির নির্দেশ অগ্রাহ্য করে। অথচ ২০২৫ সালে, নরেন্দ্র মোদী কোনো রকম সামরিক কৌশল ছাড়াই কেবল আমেরিকার নির্দেশে সেনা প্রত্যাহার করেন। এমনকি ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর আক্রমণের সময়েও তিনি সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল ১১ মে বিকেল ৩:০০টায় অনুসন্ধান করে দেখা যায়, কোনো বিবৃতি নেই—এই প্রেক্ষাপটে তাঁর মৌনতা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রপতি হিসাবে তিনি কেবল একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোট পাওয়ার কৌশল মাত্র। ভারতীয় সেনাপ্রধান বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কেউই সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিকে অবহিত করেননি।

আজ ভারত বিশ্বের কাছে একটি দিশাহীন, প্রত্যুত্তরহীন, এবং তৃতীয়পক্ষনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে চীনের বিরুদ্ধে একটি বাফার জোন হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমা দেশগুলি চায় ভারত তাদের যুদ্ধ সরঞ্জাম কিনুক, কিন্তু বাস্তব যুদ্ধে সেগুলির কার্যকারিতা যেন না পরীক্ষিত হয়। রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা হলেও এই যুদ্ধে তার ব্যবহারের কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।

মোদীর এই নীরবতা, এই যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া, এবং বিদেশি চাপের কাছে আত্মসমর্পণ ভারতের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর ফলে ক্ষুব্ধ হয়েছে রাশিয়া, বিরক্ত ইসরায়েল, হতাশ বালুচ আন্দোলন, এবং ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণ। এ এক আত্মসমর্পণের কূটনীতি—যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, কূটনৈতিক স্তরে ভারত হেরে গিয়েছে।

এই যুদ্ধবিরতি ভারতের জন্য কেবল একটি সাময়িক সামরিক ছন্দবিচ্যুতি নয়—এটি দেশের বিদেশনীতি ও নেতৃত্বের ব্যর্থতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

Read More