বিচার বিভাগের স্বেচ্ছাচার ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমালঙ্ঘন: সংবিধানের বিপরীতে সুপ্রিম কোর্টের রায়

বিচার বিভাগের স্বেচ্ছাচার ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমালঙ্ঘন: সংবিধানের বিপরীতে সুপ্রিম কোর্টের রায়

ভারতীয় সংবিধান ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার উপর আঘাত: সুপ্রিম কোর্টের এক বিপজ্জনক ও স্বেচ্ছাচারী রায়ের সমালোচনা

ভারতের সংবিধান একটি জটিল ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে নির্বাহী, বিচার বিভাগ এবং আইনসভা—এই তিনটি শাখা একে অপরের ক্ষমতার সীমা ও ভারসাম্য বজায় রেখে পরিচালিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট, এমন একাধিক রায় প্রদান করছে, যার ফলে সেই ভারসাম্য ও সীমাবদ্ধতা গুরুতরভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষত, রাষ্ট্রপতি ও গভর্নরের মতো সাংবিধানিক প্রধানদের উপর আদালতের সরাসরি নির্দেশ প্রদান করার ঘটনা একটি সাংবিধানিক বিপর্যয় এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতা অতিক্রম করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সাম্প্রতিক State of Tamil Nadu v. Governor of Tamil Nadu & Anr (Writ Petition (Civil) No. 1239 of 2023). মামলায়, সুপ্রিম কোর্ট গভর্নর এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রপতির উপর এমন নির্দেশ জারি করেছে যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। সংবিধানের ২০০ এবং ২০১ অনুচ্ছেদে গভর্নর ও রাষ্ট্রপতির আইনসংক্রান্ত ভূমিকা নির্ধারিত হলেও, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা বাধ্যতামূলক নির্দেশের বিধান নেই। অথচ আদালত এই অনুচ্ছেদগুলোর ব্যাখ্যার নামে সেই শূন্যস্থানে নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠা করছে এবং ‘ম্যান্ডেটরি টাইম ফ্রেম’ আরোপ করছে।

এই রকম পদক্ষেপ শুধুমাত্র বিচারিক overreach নয়, বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোতে একগুয়ে ‘নিয়ন্ত্রক বিচার বিভাগ’ গঠনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি একাধারে সংবিধানের ৭৪(১) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রপতির সম্মান ও সংবিধানিক মর্যাদার অবমাননা।

ভারতের সর্বোচ্চ বিচারালয়, সুপ্রিম কোর্ট, State of Tamil Nadu v. Governor of Tamil Nadu & Anr. মামলায় যে রায় প্রদান করেছে, তা শুধুমাত্র সাংবিধানিক ব্যাখ্যার সীমা লঙ্ঘনই নয়, বরং এক ধরনের ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যা গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের ভারসাম্য, এবং জাতীয় নিরাপত্তা—এই তিনটির উপরেই গুরুতর প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যকলাপ নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে যে পথে পরিচালিত করতে চেয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সাংবিধানিক কাঠামোর চরম লঙ্ঘন। রাষ্ট্রপতির মতো একজন সাংবিধানিক প্রধানের উপর আদালত সরাসরি নির্দেশ জারি করতে পারে না—এটি স্পষ্টভাবে সংবিধানের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রপতির করণীয় নির্ধারণের এই প্রয়াস একটি নির্বাহী বিষয়ে হস্তক্ষেপ, যা বিচার বিভাগের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে।

এই রায়ে আদালত কার্যত একটি নতুন আইন তৈরি করেছে এবং সেটিকে কার্যকর করতে একটি mandamus (আদেশ) জারি করেছে, যা সংসদের ভূমিকাকে অবজ্ঞা করে এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের একটি বিপজ্জনক প্রবণতা গড়ে তোলে। এই প্রবণতা বিচার বিভাগের অধিকারের সীমালঙ্ঘন বা judicial overreach এর স্পষ্ট উদাহরণ।

যখন রাষ্ট্রপতির কাছে ২০১ অনুচ্ছেদের অধীনে সম্মতির জন্য একটি বিল পেশ করা হয়, তখন যদি তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করেন এবং এই রায়ের ৩৯১ অনুচ্ছেদে আমাদের দ্বারা নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে, তখন রাজ্য সরকারের কাছে এই আদালতের কাছ থেকে একটি আদেশনামা চাওয়ার সুযোগ থাকবে।

উল্লেখযোগ্য যে, সুপ্রিম কোর্ট একে একে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে—

১. রাষ্ট্রপতির বিচারধীন বিবেচনার উপর নির্দেশ,
২. গভর্নরের সাংবিধানিক বিচক্ষণতাকে বাতিল করে দেওয়া,
৩. বিল সম্পর্কে সংসদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বিচারিক আদেশের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক মতামত চাপিয়ে দেওয়া,
৪. “পকেট ভেটো” নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া যা সংবিধানে নেই।

এটি বিচার বিভাগের এমন এক স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ, যেখানে একটি আদালত নিজেই আইন প্রণয়ন করছে এবং রাষ্ট্রপতি ও গভর্নরের মতো পদাধিকারীদের কার্যকলাপ নির্ধারণ করছে। সংবিধানে কোথাও বলা নেই যে রাষ্ট্রপতি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো নির্দিষ্টভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবেন।

সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই রায় ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী শাখা এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে একটি সাংবিধানিক সংঘর্ষকে উসকে দিতে পারে, যা দেশের প্রশাসনিক ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। যখন আদালত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিজেই নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সেটা গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৃত্যুঘণ্টা বয়ে আনে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আইনত প্রশাসনিক ভারসাম্য যদি আদালতের স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপে বিঘ্নিত হয়, তাহলে তা কেবলমাত্র রাজনৈতিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করে না—বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেও চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। যদি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপের কারণে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়, তাহলে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সংহতি ব্যাহত হতে পারে।

এই ধরনের বিচারিক হস্তক্ষেপ দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে অকার্যকর করে তুলতে পারে এবং তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের গণতন্ত্রের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

এই রায় একাধারে অবৈধ, সংবিধানবিরোধী, কর্তৃত্ববাদী এবং স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিফলন। এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য একটি গভীর সতর্ক সংকেত। আদালতের দায়িত্ব হলো সংবিধান রক্ষা করা, সংবিধান পরিবর্তন বা পুনর্লিখন করা নয়।

এই ধরনের রায়ের বিরুদ্ধে কঠোর বুদ্ধিবৃত্তিক, আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া না এলে, ভবিষ্যতে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা একটি নির্বিচার ও অনির্বাচিত বিচারিক কর্তৃত্বের হাতে বন্দি হয়ে পড়তে পারে।

Date: 17/04/2025


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *