সম্পাদকীয়: 17th March 2025
এক অনন্ত যুদ্ধের দোরগোড়ায় বিশ্ব
ইসরায়েল-গাজা সংঘাত (Israel-Gaza war) আবারও রক্তাক্ত পর্বে প্রবেশ করেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সংঘর্ষবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন সাংবাদিকও রয়েছেন। সংঘর্ষবিরতির নামে যে অস্থায়ী সমঝোতা, তা এখন ধূলিসাৎ হতে বসেছে। একদিকে ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা হামাস ও ইসলামিক জিহাদের সশস্ত্র যোদ্ধাদের টার্গেট করছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি (Palestine) পক্ষ বলছে, নিরপরাধ মানুষ মারা যাচ্ছে, এবং মিডিয়াকে নিশানা করা হচ্ছে।
এই সংঘাত আজ আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়, এটি এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা কি কখনো সমাধান হবে? নাকি এটি এক অনন্ত যুদ্ধ, যার কোনো শেষ নেই?
সংঘর্ষবিরতির অন্তঃসারশূন্যতা
১৯ জানুয়ারি ২০২৫ সালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনেক আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই চুক্তির পরও ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের মৃত্যু থামছে না।
✔️ ইসরায়েল একদিকে বলছে, তারা শুধুমাত্র “সন্ত্রাসীদের” বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে।
✔️ হামাস বলছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে এবং যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে।
✔️ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশ ব্যর্থতার দিকে এগোচ্ছে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, সংঘর্ষবিরতির অর্থ কী, যদি সেখানে প্রতিদিন মৃত্যু ঘটে?
ইসরায়েল-গাজা: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ইসরায়েল-গাজার সংঘাত নতুন কিছু নয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই ফিলিস্তিনের ভূমি দখলের প্রশ্নে সংঘর্ষ লেগেই আছে।
📌 ২০০৮: ইসরায়েলের “অপারেশন কাস্ট লিড” ১৪০০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু ঘটায়।
📌 ২০১৪: গাজায় ইসরায়েলি অভিযান ২২০০+ মানুষের প্রাণ নেয়।
📌 ২০২১: গাজায় ১১ দিনের সংঘর্ষে ২৫০+ ফিলিস্তিনি নিহত হয়।
📌 ২০২৩: ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়, ১২০০ ইসরায়েলি নিহত হয়, ২৫১ জন জিম্মি হয়। এরপর ইসরায়েল গাজায় হামলা চালায়, যার ফলে ৪৮,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়।
প্রায় প্রতি দশকে একবার বড় আকারের সংঘাত হয়, যার মধ্যে কোনো স্থায়ী সমাধান আসে না।
শান্তির পথে বাধা কোথায়?
সংঘাতের সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দুটি প্রধান পথ রয়েছে—
১️⃣ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান (Two-State Solution)
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন দুটো আলাদা রাষ্ট্র হবে। কিন্তু—
❌ ইসরায়েল কখনোই ফিলিস্তিনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়নি।
❌ পশ্চিম তীর ও গাজায় বসতি স্থাপন করে ইসরায়েল ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করছে।
❌ হামাস এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভাজন রয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনকে দুর্বল করে রেখেছে।
২️⃣ একক রাষ্ট্র সমাধান (One-State Solution)
অনেকেই বলছেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে এক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হোক, যেখানে সবাই সমান অধিকার পাবে। কিন্তু—
❌ ইসরায়েল কখনোই আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাষ্ট্রকে মেনে নেবে না।
❌ ফিলিস্তিনিরাও ইসরায়েলের অধীনে বসবাস করতে রাজি নয়।
যুদ্ধ কি শেষ হবে? নাকি এটি অনন্ত সংঘাত?
আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যে—
✅ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুধুমাত্র সামরিক লড়াই নয়, এটি এক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতও।
✅ বহুবার শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, দুই পক্ষেরই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আপস করতে চায় না।
✅ ইসরায়েল শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধকে চূর্ণ করে দিতে চাইছে।
✅ হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সন্ত্রাসী পন্থা অবলম্বন করছে।
ফলে, এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।
বিশ্ব কি এই সংঘাত থামাতে পারবে?
এই মুহূর্তে ইসরায়েল-গাজার সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ—সবাই এই সংঘাতের অবসান চায়, কিন্তু কেউই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
এদিকে, প্রতিটি নতুন যুদ্ধ আরও ক্ষোভ জন্ম দিচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা সৃষ্টি করছে। তাই বলা যায়, ইসরায়েল-গাজা সংঘাত সম্ভবত কখনোই শেষ হবে না, বরং এটি এক অনন্ত সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
যদি বিশ্ব সত্যিই শান্তি চায়, তাহলে—
🔹 ফিলিস্তিনকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
🔹 ইসরায়েলকে বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে।
🔹 আন্তর্জাতিক মহলকে নিরপেক্ষভাবে মধ্যস্থতা করতে হবে, শুধুমাত্র ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সংঘাত থামানোর কোনো বাস্তব উদ্যোগ নেই। ফলে, গাজার ধ্বংসযজ্ঞ চলতেই থাকবে, আর এই অঞ্চলের মানুষ অনন্ত অস্থিরতার মধ্যে বাস করতে বাধ্য হবে।