দেহাতি: ৪ আগস্ট, ২০২৫
ভগবান বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ৩ডি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রযুক্তি, ভক্তি ও পৌরাণিকতাকে একত্রে উপস্থাপন করে; ১০ দিনে বক্স অফিসে আয় করেছে ₹৯১.২৫ কোটি
ভারতের পৌরাণিক ঐতিহ্য এবং অ্যানিমেশন চিত্রনাট্যের জগতে এক যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে ‘মহাবতার নৃসিংহ’ চলচ্চিত্রটি ২৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে মুক্তি পেয়েই দর্শকদের হৃদয়জয় করে। ভগবান বিষ্ণুর সবচেয়ে উগ্র এবং অলৌকিক অবতার — নৃসিংহরূপ — কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই অ্যানিমেটেড মহাকাব্যে দানবরাজ হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশ্যপের ইতিহাস, দেবতা ও অসুরের দ্বন্দ্ব, এবং প্রহ্লাদ নামে এক নিষ্কলঙ্ক ভক্তের ধর্মনিষ্ঠা, এক অপূর্ব আত্মিক ও দৃষ্টিনন্দন বিন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে।
ক্লীম প্রোডাকশনস ও হোম্বলে ফিল্মসের সম্মিলিত প্রযোজনায় এবং অশ্বিন কুমারের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবির সঙ্গীত রচনা করেছেন স্যাম সি এস। কাহিনির সূচনা ঋষি কশ্যপের পত্নী দিতিকে কেন্দ্র করে, যিনি এক অশুভ লগ্নে কামনাবশত জন্ম দেন দানবসন্তান হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশ্যপকে। তারা শক্রাচার্যের নিকট থেকে শিক্ষা নিয়ে বিষ্ণুর বিরুদ্ধ শক্তি আহরণে মনোনিবেশ করে। পরবর্তীকালে যখন হিরণ্যাক্ষ বিষ্ণুর বরাহ অবতারের দ্বারা নিহত হয়, তখন হিরণ্যকশ্যপ অমরত্ব লাভ করে নিজেকে স্বয়ং ঈশ্বররূপে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার নিজ পুত্র প্রহ্লাদ হয়ে ওঠে বিষ্ণুর একান্ত ভক্ত। পিতা ও পুত্রের এই মূলগত মতানৈক্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ধর্ম ও অধর্মের বিভাজনরেখা — আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আবির্ভাব ঘটে এমন এক অবতারের, যিনি না মানুষ, না পশু, না দিনে, না রাতে — তিনি হলেন নৃসিংহ।
মাত্র সাড়ে চার কোটি টাকার ব্যয়ে নির্মিত হলেও এই চলচ্চিত্র তার কারিগরি উৎকর্ষ ও দার্শনিক গভীরতায় এক মহাকাব্যিক রূপ লাভ করেছে। দশ দিনের মধ্যেই ভারতীয় বক্স অফিসে এটি ৯১.২৫ কোটি টাকার আয় করে ফেলেছে এবং IMDb-তে ৯/১০ রেটিং অর্জন করেছে। এ এক অনন্য অ্যানিমেটেড নির্মাণ যেখানে দেবতা, অসুর, ভক্তি, হিংসা এবং তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা এক অপূর্ব ভারসাম্যে একত্রিত হয়েছে। ৩ডি প্রভাব এবং মাল্টিচ্যানেল সাউন্ড সিস্টেমে সজ্জিত এই চলচ্চিত্র দর্শককে চাক্ষুষ ও শ্রাব্য উভয় পর্যায়ে এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
হাওড়া জেলা আদালতের দুই তরুণ আইনজীবী — সোমনাথ দাস এবং মিঠু মল্লিক ভট্টাচার্য — ৩ আগস্ট ২০২৫, রবিবার দিন নিজস্ব উদ্যোগে ছবিটি দেখে একে “অ্যানিমেশন প্রেমীদের জন্য এক বিজয়-সংকেত” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, চলচ্চিত্রের ভক্তিমূলক কীর্তন র্যাপ একটি সাহসী এবং সফল প্রয়োগ। সোমনাথ দাস বলেন, “হিংসাত্মক দৃশ্যগুলি অত্যাবশ্যক ছিল, কারণ সেগুলি অধর্মের ধ্বংসকে ন্যায়সঙ্গত করে তোলে।” মিঠু মল্লিক মন্তব্য করেন, “একেবারে অর্থসার্থক — এই একটি পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক ছবি যা বৈদিক সভ্যতার মহিমা, তার অধঃপতন ও নবজাগরণকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরে।”
হাওড়া মারিয়া ডে স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী হুমা আরহম তাঁর বোন হিন্দ্রবী আরহম-এর সঙ্গে রবিবার সিনেমা হলে উপস্থিত ছিল। হুমা উচ্ছ্বসিতভাবে জানান, “অ্যানিমেশন ও ডিজিটাল ইফেক্ট গল্পের গভীরতাকে সম্পূর্ণরূপে ন্যায় দিয়েছে। ছবিটি শেখায় যে অন্যায় ও মিথ্যার শেষ অবধারিত, এবং অশুভ কখনও চিরস্থায়ী নয়।” তাঁর মতে, নৃসিংহের গর্জন হলিউডের যেকোনো অ্যানিমেটেড ফিল্মকে টক্কর দিতে পারে।
ইস্কন সহ বিভিন্ন ভক্তি আন্দোলন-সম্পৃক্ত সংগঠনগুলি চলচ্চিত্রটির ভূয়সী প্রশংসা করেছে। কাহিনি, সংগীত, গ্রাফিক্স এবং বৈদিক প্রেক্ষাপট — সবকিছুর একত্র সমন্বয়ে এটি এক এমন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে যা ভারতীয় সাংস্কৃতিক আত্মাকে পুনরায় জীবন্ত করে তোলে।
হিন্দি ভাষার সংস্করণটি দেশব্যাপী তাড়াতাড়ি জনপ্রিয়তা অর্জন করছে এবং হিন্দিভাষী দর্শকদের মধ্যে এটি এক “ফ্যামিলি ব্লকবাস্টার” রূপে আবির্ভূত হয়েছে — এমন একটি সিনেমাটিক প্রকল্প যা ভক্তি, সংস্কৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণ।
মহাবতার নৃসিংহ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক নবজাগরণ — যেখানে ভক্তি, শক্তি ও প্রযুক্তি একত্রে মিলিত হয়ে এক নবধারার সূচনা করে। ভবিষ্যতের ভারতীয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রকে এটি একটি নতুন দিশা এবং গতি প্রদান করে। যখন ছবিটি হিন্দিতে ডাব করে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়, তখনই তা স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই সৃষ্টি ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের সাংস্কৃতিক মর্মবস্তুকে সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে সক্ষম। ৩ আগস্ট, রবিবার সকালে যখন হালকা বৃষ্টির ছাঁট চারপাশকে শীতল করছিল, সেই সময়ও হাওড়ার পিভিআর অবনী মলে সকাল ৯টা’র হিন্দি শো ছিল উপচে পড়া। বহু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের নিয়ে এই শো উপভোগ করতে আসেন — এটি শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র নয়, এক পরিপূর্ণ পারিবারিক স্মৃতি হয়ে ওঠে।