দেহাতি: ১১ আগস্ট, ২০২৫
ট্রাম্প প্রশাসনের ৫০% শুল্ক বৃদ্ধি ভারতে বড় ধাক্কা, কিন্তু কেন পশ্চিমবঙ্গ তুলনামূলকভাবে প্রভাবমুক্ত—রপ্তানি কাঠামো, শিল্পভিত্তি ও বাজারভাগের কারণ বিশ্লেষণ
মার্কিন প্রশাসনের ৫০ শতাংশ শুল্কবৃদ্ধি ভারতের প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে রপ্তানিকারক মহল সতর্ক করেছে। পোশাক ও চামড়াশিল্পই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষত এই সময়ই মার্কিন বাজারে উৎসব মৌসুমের জন্য বড় অর্ডার দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই রপ্তানিকারকদের সহায়তায় বিভিন্ন পদক্ষেপ খুঁজছে। একই সঙ্গে গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও তামিলনাড়ুর মতো রাজ্য সরকারগুলিকে আলাদা ব্যবস্থা নিতে শীঘ্রই চিঠি পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে, কারণ এসব রপ্তানিমুখী রাজ্যে কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও উত্তরপ্রদেশ থেকে। FY 2024-25 সালে গুজরাটের রপ্তানির শীর্ষে ছিল পেট্রোলিয়াম পণ্য (৪৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য (১৬.৬ বিলিয়ন), রত্ন ও অলঙ্কার (৮.৩ বিলিয়ন) এবং বস্ত্র (৫.৬ বিলিয়ন)। মহারাষ্ট্রের রপ্তানিতে শীর্ষে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য (২২.৫ বিলিয়ন), রত্ন ও অলঙ্কার (১৩.৭ বিলিয়ন), রাসায়নিক (৮.১ বিলিয়ন), কৃষিপণ্য (৫.৪ বিলিয়ন) ও বস্ত্র (৩.৮ বিলিয়ন)। তামিলনাড়ুর প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য (১৮.১ বিলিয়ন), ইলেকট্রনিক পণ্য (১৪.৬ বিলিয়ন), বস্ত্র (৮ বিলিয়ন) এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য (১.৬ বিলিয়ন)।
এর তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানি কাঠামো ভিন্ন। FY 2010-11 সালে যেখানে রাজ্যের রপ্তানি ছিল ৬.৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, FY 2023-24 সালে তা বেড়ে হয়েছে ১১.৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার—বৃদ্ধি থাকলেও অন্যান্য শীর্ষ রপ্তানিকারক রাজ্যের তুলনায় শিল্পভিত্তি সীমিত। FY 2023-24 সালে পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষ ১০ রপ্তানি পণ্য ও শীর্ষ ৩ রপ্তানি বাজার ছিল নিম্নরূপ—
১. সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর গয়না: ১৪৫২.৯১ মিলিয়ন USD (১২.৪৩%) — সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র
২. লোহা ও ইস্পাত: ১২৯১.৮৬ মিলিয়ন USD (১১.০৬%) — নেপাল, বাংলাদেশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত
৩. ইস্পাতজাত পণ্য: ৮৪৭.২৫ মিলিয়ন USD (৭.২৫%) — যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, যুক্তরাজ্য
৪. চামড়াজাত দ্রব্য: ৬৪৮.৩২ মিলিয়ন USD (৫.৫৫%) — যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি
৫. পেট্রোলিয়াম পণ্য: ৫৬০.৫৯ মিলিয়ন USD (৪.৮০%) — নেপাল, ভুটান, সিঙ্গাপুর
৬. মানবকেশজাত দ্রব্য: ৫৫১.৯৪ মিলিয়ন USD (৪.৭২%) — চীন, মায়ানমার, ভিয়েতনাম
৭. সামুদ্রিক পণ্য: ৫১৩.১১ মিলিয়ন USD (৪.৩৯%) — যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান
৮. নন-বাসমতি চাল: ৪২১.৩০ মিলিয়ন USD (৩.৬১%) — ভিয়েতনাম, বেনিন, মালয়েশিয়া
৯. প্রক্রিয়াজাত দ্রব্য: ২৩৫.২৭ মিলিয়ন USD (২.০১%) — বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভুটান
১০. জৈব রাসায়নিক: ২২৪.৫৪ মিলিয়ন USD (১.৯২%) — সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব
এই তালিকা স্পষ্ট করে যে, পশ্চিমবঙ্গের বড় অংশের রপ্তানি মার্কিন বাজারনির্ভর নয়। চা-রপ্তানি আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র প্রধান ক্রেতা নয়। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব নগণ্য।
ভৌগোলিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ বঙ্গোপসাগরের তীরে এবং বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সীমান্তবর্তী হওয়ায় এটি ভারতের জন্য একটি কৌশলগত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডর। প্রতিবেশী দেশগুলির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমুদ্র ও স্থলপথে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও রাজ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক সম্পদ, দক্ষ জনশক্তি ও আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও, পশ্চিমবঙ্গে বড় আকারের রপ্তানিমুখী শিল্পক্ষেত্র গড়ে ওঠেনি।
ফলত, যদিও এই শুল্কবৃদ্ধি ভারতের জিডিপিতে প্রায় ০.৫% প্রভাব ফেলতে পারে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে এর অভিঘাত খুবই সীমিত থাকবে।