তারিখ: ১৫ মার্চ, ২০২৫
নির্বাচনমুখী বাজেট কি আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে?
চেন্নাই: তামিলনাড়ুর অর্থমন্ত্রী থঙ্গম থেন্নারাসু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৪.৩৯ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যা রাজ্যের আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সামাজিক কল্যাণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছে।
বাজেটের মূল বৈশিষ্ট্য
✅ সামাজিক কল্যাণ:
- সরাসরি নগদ হস্তান্তর এবং রাজ্য-স্পন্সরকৃত ভর্তুকির সম্প্রসারণ।
- সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পের (Samagra Shiksha) বেতন ও দ্বিভাষিক পাঠক্রমের জন্য স্বতন্ত্র তহবিল বরাদ্দ।
- কেন্দ্রীয় সহায়তা ছাড়াই শিক্ষা খাতে ৪৬,৭৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ, যা রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে।
- পিএম-আয়ুষ্মান ভারত স্বাস্থ্য প্রকল্পের বিকল্প হিসেবে রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা।
- নারী ও শিশু কল্যাণে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও স্কুল-পুষ্টি কর্মসূচির জন্য নতুন তহবিল।
✅ পরিকাঠামো উন্নয়ন:
- ৬,৪৮৩ কিমি রাস্তা উন্নয়নে ৩,৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ।
- শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে পানীয় জল, সড়কবাতি, নিকাশি ব্যবস্থা, গণপরিবহন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিকাঠামোতে বিশেষ বরাদ্দ।
- চেন্নাইয়ের কাছে ‘গ্লোবাল সিটি’ এবং দ্রুতগতির রেল ও মেট্রো প্রকল্প বাস্তবায়ন।
- বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগ, বিশেষত সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের প্রসারের জন্য নতুন উদ্যোগ।
- কৃষি পরিকাঠামো ও জল সংরক্ষণ প্রকল্পে বিশেষ বরাদ্দ, যার মধ্যে কাবেরী ডেল্টা অঞ্চলের জন্য আলাদা প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
✅ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ:
- কীঝাদি, কারিভালামভান্থানাল্লুর, এবং নাগাপট্টিনমে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ।
- ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এগমোর মিউজিয়ামে ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য গ্যালারি নির্মাণ।
- তিরুক্কুরালের ৪৫টি ভাষায় অনুবাদ প্রকল্পের মাধ্যমে তামিল ঐতিহ্যের বিশ্বায়ন।
- কাবেরী-পুম্পত্তিনম থেকে নাগাপট্টিনম পর্যন্ত গভীর সমুদ্র গবেষণা, যা রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে তামিল বাণিজ্যের ইতিহাস উন্মোচনে সহায়ক হবে।
বাজেটের চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
🔸 ঋণের বোঝা বৃদ্ধি:
বাজেটে কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর জন্য বিপুল ব্যয় বরাদ্দ থাকলেও, রাজ্যের ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ৭ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বাজেটের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
🔸 রাজস্ব ঘাটতি ও কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত:
- কেন্দ্রীয় সরকারের তিন-ভাষা নীতির বিরোধিতার কারণে শিক্ষা খাতে ২,১৫২ কোটি টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাজ্যকে স্বাধীনভাবে এই ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
- পেট্রোলিয়াম ও জিএসটি শেয়ার সংক্রান্ত ইস্যুতে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
🔸 শিল্প ও বিনিয়োগ:
- বাজেট স্থানীয় শিল্প ও স্টার্টআপগুলিকে উত্সাহিত করলেও, রাজ্যে নতুন বিনিয়োগের হার কম, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
- শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা রাজ্যের উচ্চ ঋণ এবং কর কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
বাজেটের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
⭐ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনাম কল্যাণমূলক ব্যয়
তামিলনাড়ুর বাজেট দ্রাবিড় রাজনীতির কল্যাণমূলক মডেলকে শক্তিশালী করেছে, তবে ঋণের বোঝা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ অর্থনীতির ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। কল্যাণমূলক ব্যয় বাড়ানো হলেও, রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি না হলে দীর্ঘমেয়াদে এই মডেল টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
⭐ নির্বাচনী প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক কৌশল
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বাজেট ডিএমকের সামাজিক কল্যাণ মডেলকে আরও সুসংহত করেছে, যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও কৃষক শ্রেণির ভোট আকর্ষণ করতে পারে। তবে ঋণ বৃদ্ধি ও কেন্দ্রের সঙ্গে বিরোধ রাজ্যের আর্থিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
কল্যাণ বনাম অর্থনৈতিক ভারসাম্য
তামিলনাড়ুর বাজেট দ্রাবিড় রাজনীতির কল্যাণমূলক মডেলকে শক্তিশালী করেছে, তবে ঋণের বোঝা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ অর্থনীতির ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। আগামী বছরগুলিতে এই বাজেট দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে কি না, তা দেখার বিষয়।
তামিলনাড়ুতে এক টাকা কীভাবে খরচ হয়

ছবি: তালিনাডু অর্থ বিভাগ