রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলাদেশের শাহজাদপুরের পৈতৃক বাসভবনে হামলা সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সভ্যতার ধারাবাহিকতার উপর সরাসরি আঘাত।
কলকাতা, ১৬ জুন ২০২৫ – বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বাড়ি ‘কাচারি বাড়ি’তে হামলার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। ৮ জুন তারিখে একটি মোটরসাইকেল পার্কিং নিয়ে বিতর্ক থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে একদল অসামাজিক উপাদান ‘কাচারি বাড়ি’র জানালা, ফার্নিচার ও অডিটোরিয়ামে ক্ষতি করেছে এবং রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক স্লোগান তোলা হয়েছে। এই ঘটনা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতির উপর একটি সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ জুন তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি চিঠি লিখে এই নৃশংস কাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি চিঠিতে বলেন, “কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুমাত্র বাংলার গর্ব নন, তিনি বিশ্ব সভ্যতার একজন মহান আইকন। এই হামলা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর একটি অভূতপূর্ব আঘাত।” তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তিদানের দাবি করেছেন।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মুহাম্মদ ইউনুস, এই হামলাকে ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’ থেকে উদ্ভূত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তারা দাবি করেছেন, এই ঘটনায় কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। ভারতের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই হামলাকে একটি ‘পূর্বপরিকল্পিত’ হামলা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। তাদের দাবি, এই ঘটনার পেছনে জামায়াতে ইসলামি ও হেফাজতে ইসলামের মতো মৌলবাদী ইসলামি গোষ্ঠীগুলি রয়েছে।
বিজেপি একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতারও কড়া সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এই ধরনের ঘটনা শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, গোটা উপমহাদেশের বহু প্রজন্মের অর্জিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি চরম অবমাননা। এই ঐতিহাসিক স্থানটি শুধুই একটি ভবন নয়, এটি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক।
ঘটনার সময় জনতা রবীন্দ্র কাছারিবাড়ির জানালা, দরজা, আসবাবপত্র ধ্বংস করে এবং জাদুঘরের পরিচালকের উপর হামলা চালায়—যা এক অগ্রহণযোগ্য বর্বরতা। সরকার এটিকে ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’ বলে ব্যাখ্যা করলেও, অনেকেই এটিকে পূর্বপরিকল্পিত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর আঘাত হিসেবে দেখছেন।
এই হামলা কেবল অতীতকে মুছে ফেলার চেষ্টা নয়, বরং দুই বাংলার মধ্যকার ঐক্যের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করারও একটি সংকেত। সভ্য জাতি হিসেবে, এমন ঘটনার প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত দ্রুত, কঠোর এবং স্বচ্ছ।
বাংলাদেশ সরকারকে এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এটাই দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পথ।
এদিকে, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার এখনো এই ঘটনার উপর কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, যা বিভিন্ন কোণ থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথের ২,০০০-এর বেশি গান ও ১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কারের ঐতিহ্য এই হামলার মাধ্যমে হুমকির মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে এলাকার স্থিতিশীলতার উপর প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলা জাতি এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি সমর্থন করছে এবং কবিগুরুর ঐতিহ্য রক্ষার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।