30th April 2025
পাকিস্তানের ভ্রান্ত ঐতিহাসিক ভিত্তি ও ন্যায়বিচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা
ভারতের স্বাধীনতার সময়ে পাকিস্তান যে রূপে আত্মপ্রকাশ করে, তা ঐতিহাসিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং নৈতিক বিবেচনায় গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। পাকিস্তানের প্রকৃত জন্ম হয়েছিল কেবল দুটি প্রদেশ নিয়ে—পাঞ্জাব ও সিন্ধ। কিন্তু সে সময়ের ক্ষমতাশালী মহল এবং উপনিবেশিক কূটচাল এর থেকে এক বিস্তৃত ও জটিল ভূখণ্ডকে একত্রে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়, যা ছিল গভীরভাবে অন্যায় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্টে স্বাধীনতা লাভ করে বালুচিস্তান, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল স্বাধীন খানের শাসিত কালাত ও ব্রিটিশ লিজে থাকা “চিফ কমিশনারস প্রভিন্স অফ বালুচিস্তান” (CCPB)। CCPB ছিল মূলত কালাত রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ, যা ১৮৮৩ সালে বার্ষিক ২৫,০০০ রুপির চুক্তিতে ব্রিটিশরা লিজ নেয়। স্বাধীনতার পরে CCPB-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সদ্ব্যবস্থা না করে, ব্রিটিশরা তা পাকিস্তানের হাতে তুলে দেয়। অপরদিকে, ব্রিটিশরা গিলগিট অঞ্চলকে জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজার কাছে ১৯৩৫ সালে ৬০ বছরের জন্য লিজ নেয়, কিন্তু ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে তা ফেরত দিয়ে দেয় জম্মু ও কাশ্মীরকে—একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
পশতুন-অধ্যুষিত “ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স”, যার রাজধানী ছিল পেশাওয়ার, ছিল ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৯৩ সালে “ডুরান্ড লাইন” নামক একটি গোপন চুক্তিতে ব্রিটিশরা তা তাদের প্রভাব অঞ্চলে আনে। উল্লেখযোগ্য যে, এই চুক্তিতে বালুচিস্তানের খান বা কালাতের সম্মতি ছিল না, ফলে আন্তর্জাতিক সীমারেখা হিসেবে এর স্বীকৃতি আদায় হয়নি। তবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতের সীমান্ত নির্ধারণে পাকিস্তান একতরফাভাবে ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমা রূপে ঘোষণা করে এবং ১৯৪৭ সালের ২রা জুলাই এক প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে জিন্নাহর প্রধান লক্ষ্য ছিল—পশ্চিমা মিত্রদের কাছে পেশাওয়ারের সামরিক ঘাঁটিকে সোভিয়েতবিরোধী নজরদারির কাজে তুলে ধরা।
এরপর Gilgit অঞ্চলে ৩১শে অক্টোবর ১৯৪৭ সালে, মেজর ব্রাউন ‘গিলগিট স্কাউটস’ এর বিদ্রোহ সংগঠিত করে জম্মু ও কাশ্মীরের কাছ থেকে গিলগিট ছিনিয়ে নেয় এবং তা ২রা নভেম্বর পাকিস্তানে সংযুক্ত করে। স্বাধীন বালুচিস্তানের ওপরও পাকিস্তান থেমে থাকেনি— ১৯৪৮ সালের ২৭শে মার্চ কালাত রাজ্যকে একতরফাভাবে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে বালুচিস্তানের স্বাধীনতা মুছে যায় এবং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ডুরান্ড লাইনের বৈধ দাবিদারও নিশ্চিহ্ন হয়।
এই সমগ্র ইতিহাস একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক দখলদারির কাহিনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ধূর্ত পদক্ষেপ এবং পাকিস্তানের প্রাথমিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক স্বার্থমণ্ডিত সিদ্ধান্তের কারণে আজও আফগানিস্তান, ভারত, বালুচিস্তান অঞ্চলের মানুষ একটি ন্যায্য ভূখণ্ড ও আত্মপরিচয়ের জন্য সংগ্রাম করছে।
সময় এসেছে সত্য উদঘাটনের, এবং ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার। পাকিস্তানের প্রকৃত ও ন্যায়সঙ্গত ভূখণ্ড কেবলমাত্র পাঞ্জাব ও সিন্ধ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুসারে সিন্ধকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।
বালুচিস্তান, গিলগিট-বাল্টিস্তান, ও খাইবার পাখতুনখাওয়া (সাবেক NWFP), অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ তাদের জনগণের মতামতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। উপনিবেশিক ক্ষমতার অন্যায় কূটনীতি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সেই অবিচারের মাটি থেকে নতুন এক সুবিচারের বীজ রোপণ করাই আজ সময়ের দাবি।
Read also
পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও সামরিক ক্ষমতা: এক বিস্তৃত বিশ্লেষণ