June 14, 2025
ইঞ্জিন থ্রাস্ট হারানোর কারণে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়া বিমানটি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে ভেঙে পড়ে
আহমেদাবাদে বিমান বিধ্বস্ত: এক দশকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় ২৪০ জনের মৃত্যু
আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি এয়ার ইন্ডিয়া বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে (১২ই জুন ২০২৫) এই দুর্ঘটনায় ২৪০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিমানটিতে মোট ২৪২ জন আরোহী ছিলেন এবং তাদের মধ্যে মাত্র একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
বিমানটি আহমেদাবাদ থেকে উড্ডয়নের পরপরই একটি মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের উপর ভেঙে পড়ে, যখন হোস্টেলের ভেতরে ছাত্ররা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে ইঞ্জিন থেকে উৎপন্ন থ্রাস্ট বা ধাক্কা শক্তির আকস্মিক হারানোকে দায়ী করা হচ্ছে। এই ধরণের থ্রাস্ট হারানো সাধারণত ইঞ্জিন ব্যর্থতা, যান্ত্রিক ত্রুটি, জ্বালানির সমস্যা, বা মানবিক ভুলের কারণে ঘটে থাকে।
যান্ত্রিক ত্রুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ভেঙে যাওয়া, ফুয়েল পাম্প বা বিয়ারিং-এর ব্যর্থতা, কিংবা টারবাইন ব্লেড ভেঙে পড়া। এছাড়া বিমানের ইঞ্জিনে পাখি বা রানওয়ে থেকে উড়ে আসা ধূলিকণা ও বস্তুর আঘাতে ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় ফোরেন অবজেক্ট ড্যামেজ বা FOD। ইঞ্জিনে বাতাস প্রবাহে বাধা তৈরি হলে কমপ্রেসার স্টল হয়, যার ফলে ইঞ্জিন হঠাৎ শক্তি হারাতে পারে।
জ্বালানির সমস্যা, যেমন জ্বালানি পৌঁছাতে না পারা (ফুয়েল স্টারভেশন), জ্বালানির দূষণ, কিংবা সম্পূর্ণ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ। যদিও আধুনিক বিমানে জ্বালানি হিসাব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা হয়, তবুও কিছু ক্ষেত্রে ভুল গণনা বা জরুরি অবতরণের প্রয়োজনে জ্বালানি ফুরিয়ে যেতে পারে।
মানবিক ভুলও (Error by Pilot) এই ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। যেমন, টেকঅফের সময় ফ্ল্যাপ বা স্ল্যাট সঠিকভাবে সেট না করা হলে বিমান পর্যাপ্ত লিফট তৈরি করতে পারে না। আবার পাইলট ভুলবশত কার্যকর ইঞ্জিনটি বন্ধ করে দিতে পারেন বা পর্যাপ্ত থ্রাস্ট সেট না করলে বিমানের গতি কম থাকে, যা টেকঅফের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, ভুলভাবে অংশ জোড়া লাগানো বা পুরোনো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করাও বিমানের কর্মক্ষমতায় বড় প্রভাব ফেলে। বিমানের ইলেকট্রনিক থ্রটল কন্ট্রোল সিস্টেম বা FADEC (Full Authority Digital Engine Control) ব্যর্থ হলে ইঞ্জিন পাইলটের কমান্ড অনুযায়ী কাজ না করতে পারে।
পরিবেশগত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র ঠান্ডায় বরফ জমে ইঞ্জিনের বাতাসপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়া, আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের মতো ক্ষতিকর কণার ইঞ্জিনে প্রবেশ, এবং প্রচণ্ড টার্বুলেন্স। এছাড়া উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চতা, যেখানে বাতাস কম ঘন হওয়ায় ইঞ্জিন কম থ্রাস্ট উৎপন্ন করে, এসব অবস্থাতেও বিমানের ওড়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
টেকঅফের সময় এই ধরণের থ্রাস্ট হারানো সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ সেই মুহূর্তে বিমান অত্যন্ত নিচুতে থাকে এবং পাইলটদের হাতে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় প্রায় থাকে না। এছাড়া ল্যান্ডিং গিয়ার ও ফ্ল্যাপ তখনো প্রসারিত থাকায় বিমানে প্রচণ্ড ড্র্যাগ থাকে, যা কাটিয়ে উঠতে বেশি থ্রাস্ট প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বিমান তখন এমন গতিতে থাকে, যা স্টল স্পিডের খুব কাছাকাছি, অর্থাৎ অল্প ব্যালান্সে বিমান নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।
এ ঘটনার পর ভারতের বিমান চলাচলে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরদারিও বেড়েছে। সরকার শোক প্রকাশ করে নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
এই দুর্ঘটনার তদন্তে একটি উচ্চ পর্যায়ের দল কাজ শুরু করেছে এবং বিমানের ব্ল্যাকবক্স ও ফ্লাইট রেকর্ডার উদ্ধার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ (DGCA) জানিয়েছে, চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট (আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) কনভেনশনের পরিশিষ্ট ১৩ এবং বিমান (দুর্ঘটনা ও ঘটনা তদন্ত), বিধি ২০১৭ এর বিধি ১৩(১) অনুসারে) পেতে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। বিমান চলাচলের ইতিহাসে এই দুর্ঘটনা আরেকটি কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে।
Read More
এয়ার ইন্ডিয়া বিমানে বোমা হুমকি, আহমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনায় ২৬৫ জনের মৃত্যু