কীভাবে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে উঠল ?

/home/tanmoy/Downloads/How Pakistan became a nuclear power.webp

Date: June 13, 2025

ভারতের ১৯৭৪ সালের পারমাণবিক পরীক্ষার প্রতিক্রিয়া, এ কিউ খানের চোরাপথ, বৈশ্বিক রাজনীতির সুযোগ ও চীনের সহায়তায় গড়ে ওঠা পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির অন্দরকাহিনি

বিজেপি শাসনকালে জাতীয় নিরাপত্তার বদলে নির্বাচনী রাজনীতি প্রাধান্য পেয়েছে বলেই পাকিস্তান চীনের ছত্রছায়ায় পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পেরেছে, মনে করছেন বিশ্লেষকরা

পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের যাত্রা একদিকে যেমন ছিল প্রবল রাজনৈতিক সংকল্পের ফল, তেমনি অন্যদিকে ছিল একটি সুগভীরভাবে গোপন, বিভাজিত ও জটিল বৈজ্ঞানিক ও চোরাচালানভিত্তিক প্রকল্প। আন্তর্জাতিক চাপ, গোয়েন্দা নজরদারি, এবং নিষেধাজ্ঞা—সবকিছুর মাঝেও পাকিস্তান যেভাবে সফলভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলল, তা আজও আধুনিক ভূরাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

এর সূচনা হয় ১৯৭৪ সালে ভারতের “Smiling Buddha” নামক পারমাণবিক পরীক্ষার পর। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সেই সময় বলেছিলেন, “ভারত যদি বোমা বানায়, তবে আমরা ঘাস খেয়ে থাকব, কিন্তু নিজের বোমা অবশ্যই বানাব।” ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের কাছে পরাজয় ও বাংলাদেশের সৃষ্টি পাকিস্তানের মনোবলে তীব্র আঘাত হানে। এই মনোস্তাত্ত্বিক ক্ষত থেকেই শুরু হয় “Project-706”—একটি প্রতিরোধমূলক পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি।

এই কর্মসূচিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন ড. আবদুল কাদির খান, যিনি ইউরোপীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রতিষ্ঠান URENCO-তে কাজ করার সময় গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তির নকশা চুরি করে ১৯৭৫ সালে পাকিস্তানে ফেরেন। কাহুটা গবেষণা কেন্দ্রে (KRL) তাঁর নেতৃত্বে একটি বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরি হয়। প্রতিটি ইউনিটকে নির্দিষ্ট সীমিত তথ্য দেওয়া হতো—একজন যা জানত, অন্যজন জানত না। ফলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষে পুরো চিত্র বোঝা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কিউ খান এমন এক কালো বাজারভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বহু কোম্পানি ও ব্যক্তিকে যুক্ত করে। কিছু কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে, কিছু অনিচ্ছাকৃতভাবে, ডুয়াল-ইউজ পণ্যের মাধ্যমে পাকিস্তানকে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও উপাদান সরবরাহ করে। যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে সাধারণ বৈদ্যুতিক সামগ্রীর আড়ালে পারমাণবিক কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম চলে আসে পাকিস্তানে।

বিশ্ব রাজনীতিও পাকিস্তানের জন্য সহায়ক হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণের পর ১৯৮০-এর দশকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “মুজাহিদীন”-দের সহায়তাকারী প্রথম সারির মিত্রে পরিণত হয়। এই কৌশলগত সম্পর্কের ফলে আমেরিকা পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর চাপ অনেকটা কমিয়ে দেয়, কখনো aid প্যাকেজের মাধ্যমে পাকিস্তানকে নিরস্ত করার চেষ্টা করে—যা ব্যর্থ হয়। নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলেও তা বহু ক্ষেত্রে দেরিতে আসে বা আবার তুলে নেওয়া হয়।

তবে একমাত্র এ কিউ খান নয়, পাকিস্তানের পারমাণবিক উন্নয়নের পেছনে ছিল একটি শক্তিশালী দেশীয় বৈজ্ঞানিক কাঠামো। পাকিস্তান অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন (PAEC) দশকের পর দশক ধরে পারমাণবিক বিজ্ঞানে গবেষণা করে আসছিল। নোবেলজয়ী পদার্থবিদ আবদুস সালাম এই কর্মসূচির তাত্ত্বিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

গোপনীয়তা বজায় রাখতে পাকিস্তান একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে: গোপনে গড়ে তোলে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা, বিভাজিত দল দিয়ে কাজ পরিচালনা করে যাতে কেউ পুরো চিত্র জানে না, এবং বিদেশি গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করতে ভুয়া তথ্য ছড়ায়।

এমনকি CIA, RAW বা Mossad-এর মতো সংস্থার পক্ষে এই ধরণের একটি ব্যাপক গোপন কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে থামানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। ডুয়াল-ইউজ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করাও জটিল, কারণ এর বেসামরিক ও সামরিক দু’ধরনের প্রয়োগ থাকতে পারে। এ কিউ খানের নেটওয়ার্ক বহু দেশে বিস্তৃত ছিল এবং তা ভাঙতে বহু বছর লেগে যায়।

পাকিস্তানের কর্মসূচি ছিল জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ, চোরাপথে প্রযুক্তি আহরণ, আন্তর্জাতিক সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং দেশীয় বিজ্ঞানীদের গোপন শ্রমের সমন্বয়। এই কর্মসূচিতে বিদেশি সহযোগিতাও ছিল, যদিও অনেকটাই অননুমোদিত বা বিতর্কিত পথে।

বিশেষ করে চীনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মনে করা হয়, পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে ইউরেনিয়াম ভিত্তিক পারমাণবিক বোমার নকশা, HEU (Highly Enriched Uranium) এর নমুনা, এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পায়। চীনা বিজ্ঞানীরা পাকিস্তানি প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। চীন পাকিস্তানকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও সরবরাহ করে—যা পারমাণবিক অস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক।

অন্যদিকে, সৌদি আরবও আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাকিস্তানের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে বলে ধারণা করা হয়। যদিও কোনো সরাসরি “বোমার বিনিময়ে টাকা” চুক্তির প্রমাণ নেই, তবুও অর্থনৈতিক সহায়তা একটি বড় ভূমিকা রেখেছে।

প্রথমদিকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক “Atoms for Peace” কর্মসূচির অধীনে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি পেত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ফ্রান্স গবেষণাগার ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে সাহায্য করেছিল। যদিও ভারতের ১৯৭৪ সালের পরীক্ষার পরই এই শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা সামরিক উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।

ভারতের পারমাণবিক কৌশল ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এখন আরও জোরালোভাবে উঠছে, বিশেষ করে যখন পাকিস্তান আজ একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরমাণু শক্তিধর দেশের তালিকায় নিজের অবস্থান পাকা করে নিয়েছে। আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড নিয়ে পাকিস্তান এখন বিশ্বের সেই নয়টি দেশের একটিতে পরিণত হয়েছে, যারা পরমাণু অস্ত্র ধারণ করে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি—Nuclear Non-Proliferation Treaty (NPT)—স্বাক্ষর করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে ভারত ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে একদিকে যেমন নিজেদের সামরিক ক্ষমতা জাহির করতে চেয়েছিল, তেমনি এই পরীক্ষাকে নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বাজপেয়ীর “পরমাণু গর্ব” এবং তার গণমাধ্যমে প্রচার ছিল অনেক বেশি—কিন্তু এই প্রচারের আড়ালে পাকিস্তানের পারমাণবিক অগ্রযাত্রাকে কার্যত অবহেলা করা হয়েছিল।

বিজেপি সরকারের অধীনে ভারতের নীতি প্রায়ই ‘নির্বাচনী মোডে’ চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ে দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণের চেয়ে তাৎক্ষণিক জনমোহন নীতিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পাকিস্তানের ইসলামপন্থী সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেকটা ‘ফ্রি-হ্যান্ড’ তৈরি হয়েছে, বিশেষত চীনের কৌশলগত ছত্রছায়ায়।

চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তুলেছে, যাতে রয়েছে স্ট্র্যাটেজিক, অপারেশনাল এবং ট্যাকটিক্যাল অস্ত্রের পূর্ণ পরিসর। এই অস্ত্রসম্ভার ভারতের বিস্তৃত ভূখণ্ড এবং তার বাইরের অঞ্চলগুলো পর্যন্ত টার্গেট করতে সক্ষম। পাকিস্তান এমনকি ক্ষুদ্র পারমাণবিক অস্ত্র (tactical nuclear weapons) তৈরি করেছে যা সীমান্ত সংঘাতে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য, এবং এই অস্ত্র ভারতের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ভারতের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটি হুমকির প্রতিক্রিয়ায় এখনও পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত এবং দৃঢ় প্রতিরক্ষা কৌশলের অভাব স্পষ্ট। NPT-র বাইরের একটি দেশ হিসেবে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় তার কর্মসূচি অবারিত গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বের পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর নজর থাকলেও, ভূরাজনৈতিক সমীকরণ, বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান মৈত্রী, এই নজরদারিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে।

বর্তমানে ভারতের নিরাপত্তা পরিবেশ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সীমান্তে নিয়মিত সংঘর্ষ, চীনের আগ্রাসী নীতি এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা একত্রে ভারতের জন্য একটি বহুস্তরীয় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মোকাবিলায় কেবল সামরিক শক্তি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্র নীতি, দৃঢ় গোয়েন্দা কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য।

পাকিস্তানের আজকের পারমাণবিক ক্ষমতা কেবলমাত্র একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়—এটি এক কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভারতের ওপর চিরস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের উচিত হবে নির্বাচন-নির্ভর রাজনৈতিক চালচলনের পরিবর্তে জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর চিত্রে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা, কারণ পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি আর শুধুই থিওরেটিকাল নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল এক ব্যতিক্রমী নজির, যেখানে একটি দেশ আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে, এক প্রচণ্ড জাতীয় সংকল্প, রাষ্ট্রের প্রশ্রয় ও অপরিসীম গোপনীয়তা বজায় রেখে নিজেকে পরমাণু শক্তিধর করে তুলেছিল।

Read More:

পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও সামরিক ক্ষমতা: এক বিস্তৃত বিশ্লেষণ