দেহাতি: ৫ আগস্ট, ২০২৫
বর্জ্য ব্যবস্থার বিপর্যয়, রাস্তায় কুকুর আর আবর্জনায় ভরতি শহর
দেশের বার্ষিক পরিচ্ছন্নতা সমীক্ষা ‘স্বচ্ছ সর্বেক্ষণ’-এর ২০২৫ রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া শহরকে ভারতের সবচেয়ে নোংরা শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এক লক্ষের বেশি জনসংখ্যাবিশিষ্ট দেশের দশটি সবচেয়ে অপরিচ্ছন্ন শহরের তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে পশ্চিমবঙ্গেরই দশটি শহরের নাম রয়েছে—এই তালিকায় হাওড়ার পরেই রয়েছে কল্যাণী, মধ্যমগ্রাম, কৃষ্ণনগর, আসানসোল, রিষড়া, বিধাননগর, কাঁচরাপাড়া, কলকাতা ও ভাটপাড়া। কলকাতা ও ভাটপাড়া ছাড়া বাকি আটটি শহরের পরিচ্ছন্নতা নম্বর ১,০০০-এরও নিচে।
হাওড়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নোংরা অবস্থার চিত্র ভয়াবহ। রাস্তায় বেওয়ারিশ কুকুর, জমে থাকা আবর্জনার স্তূপ, জলাবদ্ধতা, ও অনিয়মিত বর্জ্য অপসারণের ফলে গোটা শহর জুড়েই দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হাওড়া পৌরসভায় বহু বছর ধরে নির্বাচন হয়নি, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শহর পরিচ্ছন্ন রাখার ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও পালন করতে পারছে না।
রামকৃষ্ণপুর ঘাট থেকে গঙ্গার দৃশ্যই বলছে শহরের অবস্থার কথা—নদীর ধারে জমে আছে প্লাস্টিক, পচা খাবার আর পচনশীল বর্জ্য। হাওড়া আদালত চত্বর, সদর থানা, হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা—সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে ময়লা ও কুকুরের উৎপাত। সোমবার ও মঙ্গলবারের অগোছালো ও অস্বচ্ছ মঙ্গলাহাটে আইনজীবী ও আদালত-গামী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
দক্ষিণ হাওড়া অঞ্চল মারাত্মক জলাবদ্ধতার সমস্যায় জর্জরিত। নিকাশি নালাগুলি একেবারে বন্ধ, বর্জ্য সংগ্রহের কোনও নির্দিষ্ট সময় বা নিয়ম নেই। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। দানেশ শেখ লেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সন্ধ্যাবাজার এলাকায় জল জমে থাকে দীর্ঘ সময়, ফুটপাথ দখল করে বসেছে বেআইনি হকারেরা। কাজীপাড়া অঞ্চলে প্রতিদিন ঝাড়ু দেওয়ার প্রথা কার্যত বিলুপ্ত। শিবপুর বাজার এলাকাজুড়ে দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া দুষ্কর। আই.সি. বসু রোড পরিণত হয়েছে হাওড়া পাইকারি মাছ ও সবজির বাজারের আবর্জনার গুদামে।
আবার, হাওড়ার ১.৪ কোটির বেশি জনসংখ্যার চাপ শহরের ওপর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যার ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়ে উঠেছে দুরূহ। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই, নেই উপযুক্ত অর্থ বরাদ্দ ও প্রযুক্তি। হাওড়া পুরসভার বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর—একাধিক ওয়ার্ডে দিনের পর দিন আবর্জনা জমে থাকছে। বহু অঞ্চলেই ঘনবসতিপূর্ণ অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে, যেখানকার বর্জ্য সংগ্রহের কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার কোনও ব্যবস্থা নেই, ফলে গলিপথ, মোহল্লা রাস্তাগুলি কুকুরের বিষ্ঠায় ভরে উঠছে।
নাগরিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত শিক্ষা, এবং পরিবেশবান্ধব মনোভাবের অভাব গোটা সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলেছে। বর্ষার সময় এই অচল পরিকাঠামোই শহরের মুখে চূড়ান্ত অপমান টেনে আনে।
উল্লেখযোগ্য যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রীয় ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’-এ যোগ দেয়নি। এর ফলে রাজ্যের পুরসভাগুলি কেন্দ্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত, এবং পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনও জবাবদিহি নেই। হাওড়া পৌর কর্পোরেশনে তাই যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে—‘কাজ নেই, অগ্রগতি নেই, লজ্জাও নেই।’ সরকারি অবহেলা, নাগরিক উদাসীনতা, আর প্রকৃত প্রশাসনিক পরিকল্পনার অভাব মিলিয়ে হাওড়াকে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।
১৮২২ সালের ১লা মে, হুগলি ও হাওড়ার কালেক্টরেটকে সম্পূর্ণরূপে বর্ধমান থেকে পৃথক করা হয়। সেই সময় হাওড়ার জন্য পৃথক কালেক্টর নিযুক্ত হলেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রয়ে গিয়েছিল হুগলি থেকেই। ১৮৬২ সালে গঠিত হয় হাওড়া পৌরসভা, যা ১৯৮৪ সালে পৌর কর্পোরেশনে উন্নীত হয়। কর্পোরেশন হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল যে, হাওড়া পুরসভা আরও দক্ষ হবে এবং নাগরিক পরিষেবাগুলির মান উন্নত হবে। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি।
আজ হাওড়া পুরসভার অব্যবস্থা চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি দপ্তরেই কার্যত অদক্ষতা প্রকট। বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য নিযুক্ত ঠিকাদারিভিত্তিক ঝাড়ুদাররা সংখ্যায় যেমন অপ্রতুল, তেমনই কাজের দায়িত্ব পালনেও চূড়ান্ত ব্যর্থ। শহরকে পরিষ্কার রাখার ন্যূনতম প্রয়াসও দেখা যাচ্ছে না। ২০১৮ সালের পর থেকে পুর পরিষেবাগুলি একের পর এক ভেঙে পড়তে শুরু করেছে—বর্জ্য অপসারণ, জলনিকাশি, পানীয় জলের সরবরাহ, রাস্তাঘাট সংস্কার—সবক্ষেত্রেই পরিষ্কার ব্যর্থতা স্পষ্ট।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হল, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর অফিস ‘নবান্ন’ এলাকাও এই অব্যবস্থার ব্যতিক্রম নয়। যদিও নবান্ন ভবনের ভিতরের পরিসর পরিচ্ছন্ন ও নিয়মিতভাবে রক্ষণাবেক্ষিত হয়, তবে এর চারপাশের রাস্তা ও বসতি এলাকাগুলির অবস্থা শোচনীয়। অল্প বৃষ্টিতেই এখানে জল জমে যায়, পথচলতি মানুষ এবং অফিসযাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এই চিত্র একটি গভীর বাস্তবের প্রতিচ্ছবি—যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন প্রশাসনিক কাঠামো এবং কর্পোরেশন হিসেবে মর্যাদা প্রাপ্তির পরেও হাওড়া নাগরিক পরিষেবা ও শহর রক্ষণাবেক্ষণে ক্রমাগত ব্যর্থ। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, কারণ নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ঝাড়ুদারদের অনুপস্থিতিতে রাস্তাঘাট হয়ে ওঠে দুর্গন্ধযুক্ত ও চলাচলের অযোগ্য।
পুরসভার অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা, এবং দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ার ফলে জবাবদিহিতার অভাব—এই তিন মিলেই আজ হাওড়াকে কার্যত ভেঙে পড়া শহরে পরিণত করেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে নবান্ন থাকলেও, শহরের প্রাণশক্তি যেন নিঃশেষ হতে বসেছে।