পরিবার আসার আগেই দেহ সরানোর অভিযোগ, ময়নাতদন্ত নিয়ে বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপের আভাস
অভয়া কাণ্ডের আবহেই ফের হুগলির সিঙ্গুরে নার্সের রহস্যমৃত্যু ঘিরে উত্তেজনা। সিঙ্গুরের এক নার্সিংহোমের বিশ্রামকক্ষ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় নন্দীগ্রামের নার্স দীপালি জানার দেহ। মাত্র তিন দিন আগে তিনি ওই নার্সিংহোমে যোগ দিয়েছিলেন। ঘটনার পরপরই পরিবার আসার আগেই দেহ সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। মৃতের মা–বাবার দাবি, তাঁদের মেয়েকে খুন করা হয়েছে, আত্মহত্যার তত্ত্ব মানতে নারাজ তাঁরা।
পরিবারের দাবি, পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া অন্যত্র সরিয়ে দিচ্ছে। প্রথমে শ্রীরামপুর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত না করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয় দেহ। সেখানে ফরেনসিক বিভাগে দেহ রেফার করার ক্ষেত্রে হাসপাতালের সুপারের চিঠিতে ‘পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি’র উল্লেখ ঘিরে আরও রহস্য তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি রাজনৈতিক চাপেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? পুলিশের অতিরিক্ত তৎপরতা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এদিকে মৃতের বাবা সুকুমার জানা অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালে নিরপেক্ষ ময়নাতদন্ত সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, দেহের ময়নাতদন্ত হওয়া উচিত এইমসে। চাপের মুখে শেষপর্যন্ত গ্রিন করিডর করে দেহ কল্যাণী এইমসে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে সঠিক ময়নাতদন্ত হবে কিনা, তা নিয়েও সন্দিহান পরিবার।
এই ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে দুই জন—নার্সিংহোমের মালিক সুবাষ ঘোড়া এবং মৃত নার্সের বন্ধু রাধাগোবিন্দ। আদালত তাঁদের দশ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু পরিবারের প্রশ্ন, আসল অপরাধীরা ধরা পড়বে তো?
এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। নার্সের পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অভয়া কাণ্ডের মতোই এবারও সত্য লুকোনোর চেষ্টা চলছে। পুলিশের আচরণ ঘিরে যেমন ক্ষোভ জমছে, তেমনই স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক বেচারাম মান্নার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
দীপালি জানার মা জানিয়েছেন, মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী ও স্বভাবের দিক থেকে উজ্জ্বল ছিল। আত্মহত্যার অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মেয়ে খুন হয়েছে। একের পর এক এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং পুলিশের ভূমিকা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করছে।
১৫ আগস্ট, ২০২৫ রাত প্রায় ১১টার সময় শিবম সেবাসদন নার্সিংহোম থেকে মৃত নার্স দীপালি জানার বাবাকে টেলিফোনে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তিনি মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকে রাতেই রওনা দেন এবং ভোর প্রায় ৩টের সময় সিঙ্গুরে নার্সিংহোমে পৌঁছন। কিন্তু সেখানে এসে দেখেন নার্সিংহোমটি সম্পূর্ণ বন্ধ, এবং তাঁর মেয়ের দেহ ইতিমধ্যেই সরিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ। পরে তিনি জানতে পারেন দেহ স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে পরিবারের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। তাঁদের অভিযোগ, পরিবারের উপস্থিতি বা অনুমতি ছাড়াই এত রাতেই দেহ সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে গোটা ঘটনার তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
হুগলির সিঙ্গুরে নার্স দীপালি জানার মৃত্যুর ঘটনায় ক্রমশ রাজনৈতিক রঙ গাঢ় হচ্ছে। পরিবারের একটাই দাবি—“আমাদের মেয়ে যেন সঠিক বিচার পায়।”
August 16, 2025