ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত: পাকিস্তানের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে

ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত: পাকিস্তানের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে

ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত: পাকিস্তানের অর্থনীতি ও কৃষি খাতে ভয়াবহ প্রভাবের শঙ্কা

নয়াদিল্লি, 25 এপ্রিল ২০২৫ – জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাঁও এলাকায় ২২ এপ্রিলে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় নিরীহ পর্যটকদের হত্যা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে টার্গেট করার পর, ভারত সরকার ঐতিহাসিক ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত করেছে। ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে এই হামলার জন্য দায়ী করেছে।

১৯৬০ সালের এই চুক্তি অনুযায়ী, পাকিস্তান ইন্দাস, ঝেলম ও চেনাব নদীর পানির ওপর অধিকারের সুবিধা ভোগ করতো। তবে ভারতের এই সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি ও পানির জোগান গভীর সংকটে পড়তে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) বা মার্কিন কংগ্রেস থেকেও এবার পাকিস্তান সহানুভূতি পাবে না বলেই আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। কেননা ধর্মীয় ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান যদি জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে না আনে, তবে শুধুমাত্র কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ও তার সামনে অপেক্ষা করছে।

 বিস্তারিত পড়ুন এখানে – ইন্দাস জলচুক্তি, ১৯৬০

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দাস জলচুক্তি এতদিন দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচিত ছিল। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে ইন্দাস নদী ব্যবস্থার ছয়টি প্রধান নদী — ইন্দাস, ঝেলম, চেনাব, রবি, বিয়াস ও শতদ্রু — কিভাবে দুই দেশ ব্যবহার করবে তা নির্ধারিত হয়। পাকিস্তানকে পশ্চিম দিকের নদীগুলির পূর্ণ ব্যবহারাধিকার দেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে ভারত পূর্ব দিকের নদীগুলি ব্যবহারে স্বাধীন ছিল।

এই চুক্তি এমন এক সময়েও কার্যকর ছিল যখন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং সীমান্তে উত্তেজনা চলমান ছিল। তবে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাঁওতে একটি নিষ্ঠুর জঙ্গি হামলায় নিরীহ পর্যটকদের হত্যার ঘটনায় ভারত সরকার এই চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেয়। জানা গেছে, হামলাকারীরা নিহতদের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করে তাদের হত্যা করে — এই জঘন্য ঘটনা কেবল ভারতীয় জনমনে ক্ষোভের সঞ্চারই করেনি, বরং কূটনৈতিক জগতেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

ভারতের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের জন্য এক গভীর সংকেত। পাকিস্তানের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি মূলত ইন্দাস নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিমের নদীগুলোর ওপর তাদের অধিকার থাকায় তারা ব্যাপক পরিমাণ সেচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। ভারতের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পাকিস্তানে পানির প্রবাহ সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, যার ফলে দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, যদি এই সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে পাকিস্তানে খাদ্য ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং জলসম্পদ নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মহলেও এবার পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতি কম। অতীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) বা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস (USC) বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানকে আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা করেছে। কিন্তু এবারের ঘটনার প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে নিরীহ মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে হত্যা করার পর, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই বদলে গেছে। পাকিস্তান যদি তাদের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত জঙ্গি সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে তারা কেবল ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও চরম চাপের মুখে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দাস জলচুক্তি স্থগিত করা কেবল একক কোনো জলবণ্টন সংকট নয়, এটি একটি গভীর কূটনৈতিক ও মানবিক সংকটের ইঙ্গিতবাহী। এটি প্রমাণ করে যে, আজকের ভূরাজনীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদ — বিশেষ করে জল — এক ধরণের কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। ভারত তার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে, এবং পাকিস্তানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা — হয় কার্যকর জঙ্গি দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা, নয়তো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে আরও বড় বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকা।