দেহাতি: ৯ আগস্ট, ২০২৫
নবান্ন অভিযানে সাঁতরাগাছি ও কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, আরজি কর মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে ক্ষোভ তুঙ্গে
আজ শনিবার রাখি পূর্ণিমার দিনে হাওড়ার ‘নীলবাড়ি’ ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়। নবান্ন পাড়ার জনৈক মহিলা অ্যাডভোকেট জানালেন যে তার ঘর থেকে বেরোবার জো নেই , চার দিকে পুলিশ এবং কমান্ড ফোর্স তাদের গলির মুখ আটকে রেখেছে । সাঁতরাগাছিতে প্রায় দুই মানুষ সমান উঁচু টিনের ব্যারিকেড, কোনা এক্সপ্রেসওয়ের বেলেপোলে আঁটসাঁট ঘেরাটোপ। বজ্রযান, জলকামান, দমকল—সব প্রস্তুত। সকাল সকাল রাস্তায় নেমে পড়েছেন পুলিশ আধিকারিকরা। হাওড়া ব্রিজে ওঠার অ্যাপ্রোচ রোডে প্রায় ১২ ফুট উঁচু লোহার গার্ডরেল মাটি খুঁড়ে পোঁতা হয়েছে, হাওড়ার কাজিপাড়ায়ও একই চিত্র। এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ঘিরে সাধারণ মানুষের তিতিবিরক্তি চরমে, কারণ দৈনন্দিন কাজকর্ম কার্যত থমকে গেছে।
বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ, সাঁতরাগাছিতে কর্মীদের ক্যাম্পে বাধা দিচ্ছে পুলিশ, বিরোধী দলনেতার পথেও আসছে পুলিশি রুখ। আরজি কর কাণ্ডের এক বছরের মাথায় বিচারের দাবিতে এই নবান্ন অভিযানের ডাক, দুর্গাপুর থেকে কোল্ডফিল্ড এক্সপ্রেসে দলে দলে রওনা দিচ্ছেন বিজেপি-বামপন্থী কর্মী ও সমর্থকরা। পতাকা ছাড়া এই অভিযানে যোগ দেবেন বামপন্থী কর্মীরা, সঙ্গে থাকবেন বিরোধী দলনেতাও, যিনি কেবল বিজেপির নেতা নন, বরং এই অভিযানের প্রতীকী মুখ।
২০২৪ সালের ৯ অগাস্ট সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কলেজ শাখার সেমিনার হল থেকে এক ৩১ বছর বয়সী মহিলা চিকিৎসকের অর্ধনগ্ন দেহ উদ্ধার হয়। দেহে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ মেলে। এই ঘটনা কলকাতা শহরের নারী নিরাপত্তা ও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে, যদিও সরকারি তথ্য অনুযায়ী শহরটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে ধরা হয়। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে তদন্তভার যায় সিবিআই-এর হাতে, কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ঘটনাস্থলের প্রমাণ নষ্ট করেছে এবং পোস্টমর্টেম প্রক্রিয়ায় অবহেলা করেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করা। সিবিআই নিজস্ব কোনও প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের তত্ত্বকেই সমর্থন করে।
শিয়ালদহ সেশন কোর্টে সঞ্জয় রায় নামে এক অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও একাধিক ইঙ্গিত রয়েছে যে ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিল এবং সঞ্জয় রায় হয়তো নির্দোষ কিংবা ফাঁসানো হয়েছে। রাজ্য আইনি সহায়তা কেন্দ্রের দেওয়া প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা অভিজ্ঞতাহীন এবং জটিল মামলাটি সামলাতে অক্ষম ছিলেন, ফলে কার্যত পুলিশের ও সিবিআই-এর গল্প আদালতে বিনা চ্যালেঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এতে স্পষ্ট যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নারীদের, বিশেষত কর্মরত বাঙালি মহিলা চিকিৎসকদের, সুরক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ। প্রথম দিন থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর এবং রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের ভূমিকা ছিল ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার দিকে, যা এখনও অব্যাহত। শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের জন্য নাগরিকদের কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই, এবং যতক্ষণ প্রতিবাদকারীরা সংবিধানসম্মত সীমা লঙ্ঘন করছেন না, ততক্ষণ পুলিশ তাদের থামাতে বা বলপ্রয়োগ করতে পারে না।

কলকাতা হাই কোর্টের উচিত হবে এই ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে সুরক্ষা দেওয়া, যদি তা রাষ্ট্র বা রাজ্যের সার্বভৌমত্বের ক্ষতি না করে। তৃণমূল–মমতা সরকারকে উচিত হবে না প্রতিবাদকারীদের বিদেশি শত্রুর মতো আচরণ করা, বরং বাংলার নাগরিকদের কণ্ঠস্বর শোনা। বিশেষ করে বাংলার নারীদের আর্তি ও নিরাপত্তার দাবি যেন প্রশাসনিক প্রাচীরের আড়ালে চাপা না পড়ে—এটাই আজকের প্রধান প্রয়োজন।
আজ মমতা সরকারের কানে পৌঁছাবে বাঙালির গর্জন, বাংলা ভাষায় গর্জন, বাঙালি নারীর সুরক্ষার গর্জন। এই গর্জন শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এটি বাংলার মাটির মানুষ, বাংলার ভাষা ও বাংলার নারীর সম্মান রক্ষার অদম্য সংকল্পের প্রকাশ। নবান্নের চারপাশে যতই লোহার প্রাচীর তোলা হোক, যতই ব্যারিকেড, বজ্রযান, জলকামান দাঁড় করানো হোক—এই গর্জনের ঢেউ রুখে রাখা যাবে না। আজকের দিনটি ইতিহাসে লেখা থাকবে, যেখানে বাংলার মানুষ প্রমাণ করবে, অন্যায়, অবহেলা আর ধামাচাপার বিরুদ্ধে বাংলার কণ্ঠস্বর কখনও স্তব্ধ হয় না।