২৯ এপ্রিল ২০২৫
পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা: উপমহাদেশে কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন সংজ্ঞা
১৯৯৮ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে পাকিস্তান বিশ্বের সপ্তম রাষ্ট্র হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয়। এরপর থেকে দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত করে চলেছে। যদিও অস্ত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট বিস্ফোরণক্ষমতা (yield) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে অনুমান করা হয় বেশিরভাগ অস্ত্রের ক্ষমতা ৫ থেকে ১২ কিলোটনের মধ্যে এবং কিছু দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে তা ৪০ কিলোটন পর্যন্ত হতে পারে।
পারমাণবিক নীতি ও কৌশল
পাকিস্তান এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক কৌশলগত পারমাণবিক নীতি ঘোষণা করেনি, তবে দেশটি “ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ” নীতির ভিত্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র রক্ষা করছে বলে মনে করা হয়। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য ভারতের পারমাণবিক ও প্রচলিত শক্তির মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা বজায় রাখা। উল্লেখযোগ্যভাবে, পাকিস্তান ঘোষণা দিয়েছে যে, পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না।
কতগুলো পারমাণবিক অস্ত্র আছে?
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানের কাছে প্রায় ১৬০টি ওয়ারহেড বা পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ রয়েছে, যা বিশ্বে ষষ্ঠ বৃহত্তম পারমাণবিক ভাণ্ডার। দেশটি সক্রিয়ভাবে নতুন অস্ত্র তৈরি করছে এবং বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ২২০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে পৌঁছে যাবে, ফলে এটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
স্থল, জল ও আকাশ—পাকিস্তানের পারমাণবিক ত্রয়ী শক্তি
আকাশপথে পারমাণবিক ক্ষমতা
পাকিস্তানের বিমান বাহিনীতে এফ-১৬ এবং কিছু মিরাজ III ও V যুদ্ধবিমান রয়েছে, যেগুলো পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের অস্ত্র বহনে সক্ষম। পাকিস্তানের বিমানভিত্তিক পারমাণবিক বাহিনীতে প্রায় ৩৬টি ওয়ারহেড রয়েছে।
- F-16 A/B: ২৪টি লঞ্চার, পাল্লা প্রায় ১,৬০০ কিমি
- Mirage III/V: ১২টি লঞ্চার, পাল্লা প্রায় ২,১০০ কিমি
- Ra’ad ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র: অত্যাধুনিক ও নির্ভুল, পাল্লা ৩৫০+ কিমি
সমুদ্রপথে পারমাণবিক ক্ষমতা
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য বাবর-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। যদিও এটি পানির নিচে থাকা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং সাবমেরিন থেকে নয়, তবে এটি পাকিস্তানের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার সম্ভাবনার দিকটি তুলে ধরে। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় পরীক্ষাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়। ভবিষ্যতে যদি সাবমেরিন থেকে পূর্ণাঙ্গ উৎক্ষেপণ সম্ভব হয়, তবে পাকিস্তান সত্যিকারের পারমাণবিক ত্রয়ী শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
স্থলভিত্তিক পারমাণবিক ক্ষমতা
পাকিস্তানের স্থলভিত্তিক পারমাণবিক ভাণ্ডারে প্রাথমিকভাবে স্বল্প থেকে মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১০২টি পারমাণবিক-সক্ষম স্থল ক্ষেপণাস্ত্র মজুদে রয়েছে।
অপারেশনাল ক্ষেপণাস্ত্রসমূহ:
- স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র: আবদালি, গজনভি, শাহিন-১, নাসর (Hatf-9)
- মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র: শাহিন-২, গৌরি
উন্নয়নাধীন ক্ষেপণাস্ত্রসমূহ:
- Shaheen-III: পাল্লা ২,৭৫০ কিমি
- Shaheen-1A: পাল্লা ৯০০ কিমি
- Ababeel MRBM: MIRV প্রযুক্তি সম্পন্ন, একাধিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানার ক্ষমতা
নাসর ক্ষেপণাস্ত্র: মাত্র ৬০-৭০ কিমি পাল্লার এই অস্ত্র ভারতীয় প্রচলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি পারমাণবিক ব্যবহারের ন্যূনতম সীমা নিচে নামিয়ে আনে—যা বিশেষজ্ঞদের মতে কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ।
ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা
পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ একদিকে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক ভারসাম্য নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে, কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারযোগ্যতা কমে আসায় পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাব্যতা বেড়ে যেতে পারে, যা গোটা অঞ্চলকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পাকিস্তানের পারমাণবিক ভবিষ্যৎ কতটা স্থিতিশীল বা হুমকিস্বরূপ হবে, তা নির্ভর করবে দেশটির কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার ওপর।