Date: 17/04/2025
ভারতের ওয়াকফ আইনের সাম্প্রতিক সংশোধন ও মুসলিম ওয়াকফ আইন, ১৯২৩-এর রদবিধান: একটি সংবিধানগত ও আইনি বিশ্লেষণ
ভারতের ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ‘ওয়াকফ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘকাল ধরে ওয়াকফ আইনের বিভিন্ন বিধান ও তার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিতর্ক এবং অস্পষ্টতা বিদ্যমান ছিল। এই প্রেক্ষিতে, ভারতীয় সংসদ ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫ পাস করেছে এবং একইসঙ্গে মুসলিম ওয়াকফ আইন, ১৯২৩ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে মুসলিম ওয়াকফ (রদ) আইন, ২০২৫ পাস করেছে। এই দুটি আইনি পদক্ষেপ কেবল আইনগত পরিসরেই নয়, বরং সংবিধানিক নীতিমালা, সম্পত্তির অধিকার, নারী অধিকার, এবং সরকারের ভূমিকা নিয়েও নতুন আলোকপাত করে।
ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫: মূল বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য
১. আইনটির নতুন ব্যাখ্যা ও পরিধি:
ওয়াকফ শব্দটির অর্থ প্রসারিত করে তাকে একটি “Unified Waqf Management, Empowerment, Efficiency and Development” কাঠামোতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়াকফ প্রশাসনকে আরও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীল করা হয়েছে।
২. সরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা:
কোনো সরকারী সম্পত্তিকে ওয়াকফ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না। সংশোধিত আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো সরকারি সম্পত্তি—যা কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের কোনও সংস্থা, পৌরসভা বা পঞ্চায়েতের নামে নিবন্ধিত—তাকে ওয়াকফ হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না। এমন ঘোষণা যদি আগে থেকেই হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট জেলার কালেক্টর তদন্ত করে তা বাতিল করবেন এবং রেভিনিউ রেকর্ড সংশোধন করবেন।
৩. ওয়াকফ গঠনের শর্ত:
ওয়াকফ গঠনের জন্য সম্পত্তির বৈধ মালিক হওয়া আবশ্যক এবং কোনও ধরনের উত্তরাধিকারহরণ, বিশেষত ওয়াকফ-আলাল-আউলাদের ফলে উত্তরাধিকারীদের—বিশেষ করে মহিলাদের—অধিকার খর্ব করা যাবে না।
৪. রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক:
প্রত্যেকটি ওয়াকফ এবং তার সম্পত্তির বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা নির্ধারিত ডিজিটাল পোর্টালে আপলোড করতে হবে ছয় মাসের মধ্যে। এই তথ্যের মধ্যে থাকবে: সম্পত্তির অবস্থান, দানকারীর নাম, ওয়াকফের উদ্দেশ্য, বর্তমান মুতাওয়াল্লির নাম ও দায়িত্ব ইত্যাদি। রেজিস্ট্রেশন ব্যতীত কোনও আইনি দাবি বা মামলা গ্রহণযোগ্য হবে না।
৫. সংরক্ষিত এলাকা ও উপজাতি জমির সুরক্ষা:
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কোন সংরক্ষিত স্মারক বা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে ওয়াকফ ঘোষণা করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলের অধীন আদিবাসীদের জমিকে ওয়াকফ ঘোষণা করা যাবে না। এটি ঐতিহাসিক সম্পদ এবং আদিবাসী অধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
৬. স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা:
এক লক্ষ টাকার বেশি বার্ষিক আয়-সম্পন্ন প্রতিটি ওয়াকফের নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক এবং সেই নিরীক্ষা রিপোর্ট সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রকাশ করতে হবে। যদি কোনও ট্রাইব্যুনাল না থাকে বা কাজ না করে, সেক্ষেত্রে হাইকোর্টে সরাসরি আপিল করা যাবে। ট্রাইব্যুনালের রায় আর চূড়ান্ত নয়—তার বিরুদ্ধেও হাইকোর্টে আপিল করা যাবে।
৭. মুতাওয়াল্লির যোগ্যতা ও দণ্ডবিধান:
যে ব্যক্তি পূর্বে অপসারিত, দণ্ডিত, বা সরকারি জমি দখল করেছেন, তিনি মুতাওয়াল্লি হতে পারবেন না। ওয়াকফ রেজিস্ট্রেশন না করা, নিরীক্ষা রিপোর্ট দাখিল না করা বা সরকারি নির্দেশ লঙ্ঘনের জন্য ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
৮. বোর্ড গঠন ও প্রতিনিধিত্ব:
ওয়াকফ বোর্ডে অন্ততপক্ষে একজন শিয়া, একজন সুন্নি, একজন OBC মুসলমান এবং প্রয়োজনে একজন বোহরা ও একজন আঘাখানি সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। বোর্ডে মহিলা সদস্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বোর্ডের সদস্য হতে পারবেন না।
মুসলিম ওয়াকফ (রদ) আইন, ২০২৫: ঐতিহাসিক আইন বাতিল
আইনের নাম ও উদ্দেশ্য:
১৯২৩ সালের The Mussalman Wakf Act ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় আইন, যার মাধ্যমে ওয়াকফ প্রশাসনের জন্য প্রাথমিক কাঠামো নির্মিত হয়। মুসলিম ওয়াকফ (রদ) আইন, ২০২৫ সেই আইনটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করেছে।
মূল বিধানসমূহ:
১. ১৯২৩ সালের আইন রদ করা হয়েছে।
২. পূর্ববর্তী আইনের অধীনে গৃহীত কার্যাবলি, দায়, বা চলমান মামলা এই নতুন রদের দ্বারা প্রভাবিত হবে না।
৩. রদের কার্যকারিতা সেই তারিখ থেকে শুরু হবে, যেদিন কেন্দ্র সরকার সরকারি গেজেটে তা ঘোষণা করবে।
আইনি তাৎপর্য:
এই আইনটি একটি উপনিবেশিক কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে আধুনিক, সংবিধানসম্মত এবং প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন ওয়াকফ ব্যবস্থাপনার সূচনা করেছে। একইসঙ্গে এটি সরকারের ভূমিকা ও জনসম্পত্তির রক্ষা নিশ্চিত করার এক সাহসী প্রচেষ্টা।
সংবিধানিক প্রেক্ষিত ও আইনি বিশ্লেষণ
এই আইন দুটি স্পষ্টভাবে ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো—বিশেষ করে সম্পত্তির অধিকার (Article 300A), নারী অধিকার (Article 15, 21) এবং ধর্মনিরপেক্ষতা (Preamble ও Article 25-28)—এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
এছাড়া, ওয়াকফ প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে একে একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোতে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রকাশ।
ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫ এবং মুসলিম ওয়াকফ (রদ) আইন, ২০২৫ ভারতীয় আইনি ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। একদিকে এটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আধুনিকীকরণ, অন্যদিকে সরকারি জমি ও জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি নারীর অধিকার, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সংবিধানিক দর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছে।
এই আইন দুটি ভবিষ্যতের জন্য এক স্থায়ী দৃষ্টান্ত, যেখানে ধর্মীয় সংস্থানগুলিকে রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে একটি সংবিধানিক কাঠামোর আওতায় এনে সুব্যবস্থাপনা ও ন্যায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
১০৭. ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫ এর শুরু থেকে , ১৯৬৩ সালের সীমা আইন, ওয়াকফের অন্তর্ভুক্ত স্থাবর সম্পত্তির সাথে সম্পর্কিত যেকোনো দাবি বা স্বার্থ সম্পর্কিত যেকোনো কার্যধারার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।