হাওড়া আদালতে ৪০ সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ: আইনজীবী মহলে ক্ষোভ ও রাজনৈতিক যোগসূত্রের অভিযোগ, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক
হাওড়া আদালতে ৪০ প্রসিকিউটর নিয়োগে মেধা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আইনজীবীদের ক্ষোভ
হাওড়া, ১৬ আগস্ট ২০২৬ — হাওড়া আদালতের ইতিহাসে কালো দিন হিসেবে ৪ আগস্ট ২০২৬-এর ঘটনাকে দেখছেন আইনজীবী মহলের একাংশ। ওই দিন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের অনুমোদনে হাওড়া জেলার জন্য ৪০ জন জেলা প্রসিকিউটর নিয়োগের সরকারি আদেশ জারি হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রসিকিউটর প্যানেল তৈরির সময় আইনজীবীদের দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা, ফৌজদারি মামলায় দক্ষতা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। জেলা বিচারক সুভাষ কুমার কর এবং জেলা শাসকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শের প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে হাওড়া আদালতের আইনজীবী মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যোগ্যতা ও পেশাগত মেধার পরিবর্তে কি রাজনৈতিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?
৪ আগস্ট ২০২৬-এর সরকারি আদেশে হাওড়া জেলার জন্য ৪০ জন প্রসিকিউটর নিয়োগের ঘটনাকে ঘিরে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হাওড়া জেলা আদালত দীর্ঘদিনের বিচারিক ঐতিহ্যের ধারক। প্রাচীন ভূরিশ্রেষ্ঠ বা ভুরশুট রাজ্য থেকে আধুনিক হাওড়া পর্যন্ত এই অঞ্চলের ইতিহাসে প্রশাসন, বাণিজ্য এবং বিচারব্যবস্থার বিকাশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। হাওড়ার নদীভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা প্রাচীনকাল থেকেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি তৈরি করেছিল। Chakrabarti-এর Judicial Administration in Bengal (1774–1947)-সহ ঐতিহাসিক গবেষণায় বাংলার বিচার প্রশাসনের বিকাশের সঙ্গে এই বৃহত্তর অঞ্চলের পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে। হাওড়া আদালতের আইনজীবী সমাজও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের আইনজীবীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে Public Prosecutor এবং Additional Public Prosecutor-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে সাধারণত অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান নিয়োগপ্রক্রিয়াকে তাই সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন Code of Criminal Procedure-এর Section 24-এ জেলা শাসককে Sessions Judge-এর সঙ্গে পরামর্শ করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের একটি প্যানেল প্রস্তুত করার বিধান ছিল। এই প্রক্রিয়ায় District Judge-এর বিচারিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পেশাগত মান, আচরণ, দক্ষতা এবং মামলা পরিচালনার ক্ষমতা বিবেচনা করার কথা। জেলা শাসকের প্রশাসনিক মূল্যায়নের সঙ্গেও সেই বিচারিক মূল্যায়নের সমন্বয় হওয়ার কথা। Kumari Shrilekha Vidyarthi v. State of U.P., AIR 1991 SC 537 মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহারও Article 14-এর অধীন এবং কোনও ক্ষমতার প্রয়োগ স্বেচ্ছাচারী বা অযৌক্তিক হলে তা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
বর্তমান ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে যে বিদায়ী Public Prosecutor সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এবং ফৌজদারি মামলায় প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী হিসেবে পরিচিত, তাঁকে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি। আরও অভিযোগ, জেলা ও দায়রা বিচারক সুভাষ কুমার কর প্রস্তাবিত প্যানেলের আইনজীবীদের বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাগত যোগ্যতা এবং ফৌজদারি মামলায় তাঁদের অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই জেলা শাসকের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছেন। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জেলার দুই প্রবীণ বিচারকের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও উপেক্ষিত হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে যে জেলা শাসক ড. (মিস) পি. দীপাপ প্রিয়া, IAS প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত আইনজীবীদের পেশাগত পটভূমি যাচাই না করেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকেও প্রস্তাবিত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কোনও তথ্য বা পেশাগত পটভূমি যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইনজীবী মহলের একাংশের অভিযোগ, Howrah Bar Association-এর সভাপতি ও সম্পাদককেও প্যানেল তৈরির ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে পরামর্শ করা হয়নি।
প্যানেলের কয়েকটি নামকে ঘিরে সাত বছরের আইনজীবী হিসেবে অনুশীলনের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীরা বিশেষভাবে দেবেন্দ্র কুমার ওঝা-র নাম উল্লেখ করেছেন, যাঁর নাম Notary Public-এর তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওমপ্রকাশ সিং-এর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সক্রিয় থাকার এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত আরও কয়েকজন আইনজীবী বাংলা ভাষায় কথা বলতে বা পড়তে পারেন না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
Alok Kr. Mondal v. State of West Bengal, (1998) 3 CALLT 146 (HC) মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণকে সামনে রেখে আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, “consultation” বলতে কেবলমাত্র কোনও একটি পক্ষের মন্তব্য বা নির্দেশ বোঝায় না; এর অর্থ কার্যকর আলোচনা এবং যৌথভাবে প্যানেল প্রস্তুত করা। কিন্তু হাওড়ার বর্তমান ঘটনায় জেলা শাসক এবং Sessions Judge-এর মধ্যে এমন কোনও অর্থবহ deliberation হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৪০ জনের অধিকাংশেরই ফৌজদারি মামলা পরিচালনার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই, তাঁরা prosecution অথবা defence—কোনও ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য criminal practice করেননি এবং হাওড়া আদালত বা কোর্টের প্রতিষ্ঠিত ফৌজদারি চেম্বারে প্রশিক্ষণ বা দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত অভিজ্ঞতাও তাঁদের অনেকের নেই।
এই পরিস্থিতি Harpal Singh Chauhan v. State of U.P., AIR 1993 SC 2436 মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সরকারি কৌঁসুলি বা District Government Counsel-এর প্যানেল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে District Magistrate এবং Sessions Judge-এর কার্যকর ভূমিকা ও প্রকৃত পরামর্শের গুরুত্ব তুলে ধরেছিল। District Magistrate-এর suitability assessment-ও বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার বাইরে নয় বলে আদালত স্বীকার করেছিল।
হাওড়ার আইনজীবী মহলে এই পরিস্থিতি নিয়ে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রসিকিউটর নিয়োগের জন্য একটি চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সেই চাপের ফলেই রাজ্যপালের কাছে প্যানেল পাঠানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় পেশাগত মেধা ও অভিজ্ঞতাকে পিছনে ফেলে রাজনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দুর্নীতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে NDPS এবং POCSO-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
প্রাক্তন Public Prosecutor অরবিন্দ নস্কর বলেছেন যে তাঁর সময়ে সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগের আগে আইনজীবীদের practice record, public conduct এবং moral standing অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হত। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, Sessions Court-এ জামিনের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে সরকারি কৌঁসুলির অবস্থান অবশ্যই জনস্বার্থ ও আইনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, কোনও রাজনৈতিক নির্দেশের ভিত্তিতে নয়।
NDPS এবং POCSO মামলায় একজন সরকারি কৌঁসুলিকে অত্যন্ত জটিল আইনগত ও প্রমাণগত বিষয় মোকাবিলা করতে হয়। NDPS মামলায় মাদকদ্রব্যের উদ্ধার, seizure, sampling, chain of custody, chemical examination এবং আইনের নির্ধারিত presumption-এর মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। POCSO মামলায় শিশুর সাক্ষ্য, forensic evidence, medical evidence, victim-related considerations এবং bail-এর ক্ষেত্রে বিশেষ আইনগত বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের মামলায় সরকারি কৌঁসুলির দায়িত্ব কেবল জামিনের বিরোধিতা করা নয়; সাক্ষ্যগ্রহণ, সাক্ষী পরীক্ষা, নথিপত্র উপস্থাপন, trial পরিচালনা এবং criminal appeal ও revision-এর ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা প্রয়োজন।
এখন Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita, 2023 (BNSS) কার্যকর হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৪ থেকে নতুন ফৌজদারি কার্যবিধির কাঠামো কার্যকর। সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগের বিধান প্রধানত BNSS-এর Section 18-এ রয়েছে। Section 18(3) অনুযায়ী প্রত্যেক জেলার জন্য রাজ্য সরকার একজন Public Prosecutor নিয়োগ করবে এবং প্রয়োজনে এক বা একাধিক Additional Public Prosecutor নিয়োগ করতে পারে। Section 18(4) অনুযায়ী District Magistrate-কে Sessions Judge-এর সঙ্গে consultation করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নামের একটি panel প্রস্তুত করতে হবে। Section 18(7) অনুযায়ী Public Prosecutor বা Additional Public Prosecutor হিসেবে নিয়োগের জন্য অন্তত সাত বছর Advocate হিসেবে practice করার শর্ত রয়েছে।
এখানে eligibility এবং suitability-এর পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাত বছর practice করা একজন আইনজীবীর statutory eligibility থাকতে পারে; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি গুরুতর ফৌজদারি মামলা পরিচালনার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর criminal practice-এর record, advocacy-এর মান, professional conduct, State-এর পক্ষে মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং criminal court-এ তাঁর professional standing যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
Harpal Singh Chauhan v. State of U.P., AIR 1993 SC 2436 মামলায় সুপ্রিম কোর্ট District Government Counsel নিয়োগের ক্ষেত্রে District Magistrate এবং Sessions Judge-এর প্রকৃত অংশগ্রহণ ও consultation-এর গুরুত্ব বিবেচনা করেছিল। আদালত স্পষ্ট করেছিল যে প্যানেল প্রস্তুতির প্রক্রিয়া কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে না এবং District Magistrate-এর suitability assessment-ও সম্পূর্ণভাবে বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে নয়।
হাওড়া এমন একটি জেলা, যার আদালতের দীর্ঘ বিচারিক ঐতিহ্য রয়েছে এবং এখানকার বহু জেলা বিচারক পরবর্তীকালে উচ্চতর বিচারিক পদে উন্নীত হয়েছেন। এই কারণে হাওড়া আদালতের পেশাগত মর্যাদা নিয়ে আইনজীবী মহলে বিশেষ সংবেদনশীলতা রয়েছে। অথচ এই বিতর্কের সময় জেলা BJP সভাপতি-র পক্ষ থেকে এখনও কোনও প্রকাশ্য মন্তব্য করা হয়নি বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ যখন নতুন ফৌজদারি আইনব্যবস্থার অধীনে প্রবেশ করেছে, তখন হাওড়ার আইনজীবী সমাজের মধ্যে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—জেলা প্রসিকিউটর নিয়োগে পেশাগত মেধা ও বিচারিক স্বাধীনতার মানদণ্ড কি অক্ষুণ্ণ থাকবে?
হাওড়ার আইনজীবী সমাজ বিভিন্ন সরকার, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং একাধিক প্রজন্মের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও তার পেশাগত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সেই ঐতিহ্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—আদালত কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; আদালত ন্যায়বিচার প্রশাসনের প্রতিষ্ঠান। সেই নীতির ভিত্তিতে বর্তমান বিতর্কের সমাধান হলে ২০২৬ সালের আগস্টের ঘটনা হাওড়া বিচারব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাসের আর একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগের ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত consultation, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং পেশাগত মেধার মানদণ্ড উপেক্ষা করা হয়েছে, তাহলে এই ঘটনা হাওড়া আদালত ও বার-এর পেশাগত স্বাধীনতা, বিচারিক যুক্তিবোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।