পাঁচবারের রামপুরহাট বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত, উদ্ধার সুইসাইড নোট
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই: প্রাক্তন মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকারের রহস্যমৃত্যু রামপুরহাটে
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু: রামপুরহাটের তৃণমূল কার্যালয়ে প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকারের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার
বীরভূম, ১৬ আগস্ট ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার, প্রাক্তন মন্ত্রী এবং রামপুরহাটের পাঁচবারের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ঘিরে রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, বীরভূমের রামপুরহাটে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এদিন সকালে রামপুরহাটে তাঁর বাড়ির কাছেই একটি তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ের একটি ঘর থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশকের রাজনৈতিক জীবনে রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্র তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। ২০০১ সালে প্রথমবার রামপুরহাট থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও ওই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অবশ্য তাঁর দীর্ঘদিনের নির্বাচনী আধিপত্যের অবসান ঘটে। বিজেপির ধ্রুব সাহা তাঁকে পরাজিত করে রামপুরহাট আসনটি দখল করেন। নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ধ্রুব সাহা ১,১১,৯২০ ভোট পান, যেখানে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৮৭,৬৮৭; জয়ের ব্যবধান ছিল ২৪,২৩৩ ভোট।
রামপুরহাটের রাজনীতিতে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি শুধু বিধায়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব তিনি সামলেছেন। ২০১৪ সালে তিনি রাজ্য মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন এবং আয়ুর্বেদ, যোগ ও ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানি, সিদ্ধ ও হোমিওপ্যাথি দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন। ২০১৫ সালে তাঁর দায়িত্বের পরিধি বাড়ে এবং তিনি বায়োটেকনোলজি, স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশন এবং প্ল্যানিং দফতরের দায়িত্ব পান।
২০১৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় সরকারের সময়ে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের কৃষিমন্ত্রী হন। সেই সময় তিনি পুণ্যেন্দু বসুর উত্তরসূরি হিসেবে কৃষি দফতরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২১ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার পদ। তিনি ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এই সাংবিধানিক পদে ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সরকারি নথিতেও তাঁকে রামপুরহাটের বিধায়ক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শিক্ষাজগতের সঙ্গে যুক্ত। তিনি রামপুরহাট কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে বিএ, এমএ এবং পিএইচডি ছিল এবং তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর তাঁর পূর্ণকালীন রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনী তথ্যেও তাঁকে অবসরপ্রাপ্ত অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রামপুরহাট বিধানসভা কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল এবং আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রধান মুখ। ২০০১ সালে তিনি তৎকালীন বিধায়ক মহম্মদ হান্নানকে পরাজিত করে প্রথমবার বিধানসভায় প্রবেশ করেন। ২০০৬ সালে তিনি ফের জয়ী হন। ২০১১ সালে তাঁর জয় বজায় থাকে এবং ২০১৬ সালে তাঁর জয়ের ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালেও তিনি বিজেপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হন। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁর পরাজয় রামপুরহাটের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসে। তাঁর মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া বলে পুলিশ সূত্রে উল্লেখ করা সুইসাইড নোট এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওই নোটে তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অভিযোগের প্রসঙ্গও তুলেছেন। তবে নোটটির সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু, তার সত্যতা এবং মৃত্যুর সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক সম্পর্কে পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।
বিশেষ করে তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদ বা TRDA-কে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে যে অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গও তাঁর মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া নোটে তিনি এই ধরনের অভিযোগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, টেন্ডার, চেক-সংক্রান্ত কাজ, পরিকল্পনা অনুমোদন বা NOC দেওয়ার মতো বিষয় তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না বলে দাবি করেছেন। এগুলি তাঁর নিজের লিখিত বক্তব্য হিসেবে তদন্তের অংশ; এগুলিকে আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখা যায় না।
রবিবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রামপুরহাটের ওই তৃণমূল কার্যালয়ের সামনে স্থানীয় মানুষ, দলীয় কর্মী-সমর্থক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ভিড় জমে যায়। দীর্ঘদিনের বিধায়ক, মন্ত্রী এবং বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হিসেবে এলাকায় তাঁর একটি সুপরিচিত রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। ফলে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু রামপুরহাটের রাজনৈতিক মহলে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ ২৫ বছর ধরে যে রামপুরহাট আসন তাঁর নির্বাচনী পরিচয়ের কেন্দ্র ছিল, ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেখানেই তিনি পরাজিত হন। তার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে নির্বাচনী পরাজয়, ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা অন্য কোনও কারণ তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে কতটা যুক্ত ছিল, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। পুলিশ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের তথ্য, উদ্ধার হওয়া নথি এবং অন্যান্য প্রমাণ পরীক্ষা করছে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও অবসান ঘটল। রামপুরহাটের পাঁচবারের বিধায়ক, রাজ্যের প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী, একাধিক দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যের প্রশাসন ও নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখন তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকেই নজর রয়েছে।