হাওড়ায় শিল্পহীনতা, কর্মসংস্থান ও সরকারি আইনজীবী নিয়োগ: সুভেন্দু সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন

Suvendu Adhikari

হাওড়া আদালতে সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ: অভিজ্ঞতা না রাজনৈতিক পরিচয়, সরকারি স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন,

হাওড়া, ১৯ আগস্ট ২০২৬। পশ্চিমবঙ্গে সুভেন্দু অধিকারী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর একশো দিনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ কার্যত শেষ। কিন্তু হাওড়ার ক্ষেত্রে এই একশো দিনে সরকারের কোনও স্পষ্ট স্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চোখে পড়েনি—এমন অভিযোগ এখন জোরালো হচ্ছে। নির্বাচনের আগে শিল্প, কর্মসংস্থান এবং হাওড়ার পুরনো শিল্পপরিচয় ফিরিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনও সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও সামনে আসেনি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সরকার হাওড়ার জন্য আদৌ কোনও নির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করেছে কি না।

একসময় হাওড়া ছিল পূর্ব ভারতের অন্যতম পরিচিত শিল্পকেন্দ্র। কারখানা, উৎপাদন, দক্ষ শ্রমিক এবং তুলনামূলক সস্তা শ্রমশক্তি—এই চারটি বিষয় হাওড়ার অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের শিল্প অবক্ষয়ের ফলে সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে CPI(M)-এর দীর্ঘ শাসনকালে একের পর এক শিল্প বন্ধ হওয়ার পর শিল্পভূমির ব্যবহারও বদলাতে শুরু করে। শিল্পের জন্য ব্যবহৃত জমির একটি বড় অংশ আবাসন ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক ব্যবহারের দিকে চলে যায়। কারখানা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে শুধু শ্রমিকের চাকরিই যায়নি; হাওড়ায় মূলধন গঠনের ধারাটিও ভেঙে যায়

শালিমার, শিবপুর, সাঁকরাইল, সালকিয়া, টিকিয়াপাড়া—হাওড়ার এই পরিচিত এলাকাগুলির দিকে তাকালে সেই পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট বলে স্থানীয় শিল্পমহলের একাংশের বক্তব্য। আজ এই এলাকাগুলির কোনওটিকেই আগের অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ manufacturing hub হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। পুরনো শিল্পের জায়গা দখল করেছে আবাসন, ছোটখাটো বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং বিচ্ছিন্ন ব্যবসা। উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতির বদলে শহরের অর্থনীতি অনেকাংশে জমি ও পরিষেবা নির্ভর হয়ে পড়েছে।

দানেশ শেখ লেন এলাকার একটি প্যাকেজিং ইউনিটকে বর্তমানে চালু থাকা সীমিত উৎপাদন কার্যক্রমের উদাহরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু সেখানে শ্রমিকের সংখ্যাও ন্যূনতম। একটি বা দু’টি ছোট ইউনিট চালু থাকা দিয়ে হাওড়ার ঐতিহাসিক শিল্পপরিচয় ফিরে এসেছে বলা যায় না। যে শহরের পরিচয় একসময় কারখানা ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেখানে manufacturing-এর সেই পরিসর আজ প্রায় অনুপস্থিত—এটাই মূল অভিযোগ।

এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েই বিজেপি নির্বাচনের আগে হাওড়ার মানুষের কাছে গিয়েছিল। চাকরি তৈরি, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পের পুনরুজ্জীবন এবং নতুন manufacturing hub গড়ে তোলা ছিল বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রচারসভাতেও শিল্প ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি গুরুত্ব পেয়েছিল। ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ হলে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের পুনর্জাগরণ হবে—এই রাজনৈতিক বার্তা হাওড়ার মতো শিল্পহীন হয়ে পড়া এলাকার ভোটারদের মধ্যে বিশেষ প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।

কিন্তু শিল্প ফিরিয়ে আনতে শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছার কথা বললেই হয় না। বড় শিল্পের জন্য প্রয়োজন বৃহৎ জমি, জমি অধিগ্রহণ, শিল্প অবকাঠামো, রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল, নিকাশি, পরিবহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা। এখানেই হাওড়ার সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রয়েছে। সিঙ্গুরে টাটা প্রকল্পের পরিণতির পরে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের জন্য জমি নেওয়া এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি করা—দুটিই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পরে কোনও উত্তর ভারতীয় বা পশ্চিম ভারতীয় শিল্পপতি হাওড়া বা সংলগ্ন এলাকায় জমি নিয়ে বৃহৎ শিল্প স্থাপনে কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে পুরনো অভিযোগ। তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ‘গুন্ডা ট্যাক্স’ এবং বিভিন্ন ধরনের বেআইনি দাবি করা হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিরোধীদের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে। সরকার বদলের পরও সেই ভয় পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা নিয়ে শিল্পমহলে সংশয় রয়েছে। ফলে শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য নতুন সরকারকে শুধু জমি নয়, বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নেও কাজ করতে হবে।

এই বৃহত্তর শিল্প ও প্রশাসনিক প্রশ্নের সঙ্গে হাওড়া আদালতে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টিকেও যুক্ত করছেন আইনজীবী মহলের একাংশ। ৪ আগস্ট বিজেপি সরকার যে Government Pleader এবং Public Prosecutor-সহ সরকারি আইনজীবীদের তালিকা প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে হাওড়া আদালতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। Government Pleader হিসেবে অভিজিৎ সেন এবং Public Prosecutor হিসেবে দেবেন্দ্র কুমার ওঝার নিয়োগ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, অভিজিৎ সেনের দেওয়ানি মামলায় পর্যাপ্ত স্বাধীন ও দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা নেই এবং তাঁর পেশাগত কাজ মূলত কয়েকটি development agreement-এর registration-কে ঘিরে অন্য আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তাঁকে হাওড়া আইনজীবী মহলে বহুল পরিচিত মুখ হিসেবেও দেখা হয় না—এমন দাবি রয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, তিনি নিয়মিতভাবে Bar Association-এর সভায় অংশ নিতেন না এবং BJP Legal Cell-এর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সংযোগ ছিল।

Public Prosecutor দেবেন্দ্র কুমার ওঝাকে নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, তিনি মূলত একজন ছোট পরিসরের Notary Public, তাঁর Criminal Court practice-এর অভিজ্ঞতা নেই বা অত্যন্ত সীমিত, অথচ Public Prosecutor-এর দায়িত্ব মূলত গুরুতর ফৌজদারি মামলায় রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর BJP Legal Cell-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টিও নিয়োগের ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে বলে অভিযোগ।

এই অভিযোগগুলির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য বা সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা থাকলে তা-ও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। কারণ সরকারি আইনজীবী নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় থাকাটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়; পেশাগত দক্ষতা, আদালতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, মামলার ধরন সামলানোর সক্ষমতা এবং সরকারের স্বার্থ রক্ষার ক্ষমতাই মূল বিচার্য হওয়া উচিত—এমনটাই আইনজীবী মহলের সমালোচকদের বক্তব্য।

হাওড়ার ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আগামী দিনে সরকারের সামনে বড় ধরনের Land Acquisition litigation, municipal taxation dispute, Panchayat litigation, cooperative dispute এবং infrastructure-related litigation আসতে পারে। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু হলে জমির মালিকদের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ, title, possession, mutation এবং acquisition procedure নিয়ে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে contractor, tender, land-use, municipal permission এবং compensation সংক্রান্ত বিরোধও আদালতে যেতে পারে।

এই জায়গাতেই বর্তমান Government Pleader panel নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আইনজীবীদের একাংশের বক্তব্য, সরকারের পক্ষে এমন আইনজীবী প্রয়োজন যিনি শুধু আদালতে উপস্থিত থাকবেন না, বরং সরকারের সিদ্ধান্তের আইনি ঝুঁকি আগে থেকেই চিহ্নিত করতে পারবেন এবং কঠিন মামলায় সরকারের পক্ষে শক্তিশালী defence তৈরি করতে পারবেন। বড় জমি অধিগ্রহণ বা শিল্প প্রকল্পের মামলায় পক্ষের আইনজীবী যদি অভিজ্ঞ না হন, তাহলে প্রশাসনের একটি ভালো প্রকল্পও আদালতে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

হাওড়া আদালতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এবং কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন—এমন একাধিক আইনজীবীকে বিবেচনা করা যেত বলে সমালোচকদের দাবি। উদাহরণ হিসেবে সুভেন্দু কুমার দত্ত, শৈবল চট্টোপাধ্যায়, তনয়া মিত্র এবং কাজল আদক-এর নাম উঠে এসেছে।

Government Pleader-এর পাশাপাশি Additional Government Pleader-দের তালিকা নিয়েও একই প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, তালিকাটি দেখলে মনে হয় না যে সরকারি সম্পত্তি, জমি, পুরসভা, পঞ্চায়েত, সমবায় এবং বৃহৎ সরকারি প্রকল্পের স্বার্থ রক্ষার জন্য কোনও সুসংগঠিত legal strategy তৈরি করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—সরকার শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে চাইলে সেই জমির মামলা কে সামলাবেন? পুরসভার বড় কর-বিরোধ কে পরিচালনা করবেন? পঞ্চায়েত সংক্রান্ত জটিল মামলা কে সামলাবেন? সমবায় সংক্রান্ত বিরোধে সরকারের অবস্থান কে রক্ষা করবেন? এমন পরিস্থিতিতে অম্লান রায় অথবা স্বরূপ সেন-কে Government Pleader পদের জন্য কেন বিবেচনা করা হল না, সেটিও যুক্তির বাইরে বলে প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবী মহলের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, উভয়েই বর্তমান Government Pleader অভিজিৎ সেনের তুলনায় অধিক অভিজ্ঞ, পেশাগতভাবে অধিক প্রবীণ এবং হাওড়ায় বিজেপি দলে বেশি অবদান রাখা ব্যক্তিত্ব

আরও বড় প্রশ্ন, কোনও বড় সরকারি প্রকল্পের বিরুদ্ধে যদি অভিজ্ঞ আইনজীবীদের একটি শক্তিশালী defence team দাঁড়ায়, তাহলে বর্তমান panel সেই মামলার মোকাবিলা কতটা করতে পারবে? প্রশ্নটি আরও সরাসরি ভাবে করা যায়—সরকারি কোনও বড় প্রকল্প আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে সরকারের স্বার্থ রক্ষা করবেন কে? উদাহরণ হিসেবে, যদি কোনও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের বিরুদ্ধে সুভেন্দু অধিকারী, শৈবল চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ আদক, গজেন্দ্রনাথ মণ্ডল, তনয়া মিত্র, গৌতম ব্যানার্জি , অলোক ভট্টাচার্য কিংবা মদন ব্যানার্জি-র মতো অভিজ্ঞ আইনজীবীরা প্রতিপক্ষের হয়ে শক্তিশালী defence দাঁড় করান, তাহলে সরকারের পক্ষে সেই মামলার মোকাবিলায় বর্তমান প্যানেল কতটা প্রস্তুত—সেই প্রশ্নই এখন উঠছে।

বিষয়টি কোনও ব্যক্তিবিশেষকে খাটো করার প্রশ্ন নয়; বরং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, জমি, সম্পত্তি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আদালতে কার্যকরভাবে রক্ষা করার মতো পেশাগত সক্ষমতা সরকারের বর্তমান legal panel-এর রয়েছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন। বিশেষত বড় জমি অধিগ্রহণ, পুরসভা ও পঞ্চায়েত সংক্রান্ত বিরোধ, সরকারি চুক্তি এবং অবকাঠামো প্রকল্পের মামলায় প্রতিপক্ষ যদি দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবীদের নিয়ে হাজির হয়, তখন সরকারের পক্ষের আইনজীবীদের অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতির প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এই প্রশ্নগুলি শুধুমাত্র আদালতের নিয়োগের প্রশ্ন নয়। এগুলি হাওড়ায় সরকারের development capacity নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। শিল্প আনতে হলে জমি লাগবে। জমি লাগলে মামলা হবে। মামলা হলে দক্ষ সরকারি আইনজীবী লাগবে। শিল্পাঞ্চল তৈরি হলে পুরসভা, পঞ্চায়েত, সমবায়, পরিবেশ, কর এবং অবকাঠামো সংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হবে। ফলে শিল্প পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা এবং সরকারের litigation management—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা যায় না।

এর পাশাপাশি হাওড়ার দৈনন্দিন সমস্যাগুলিও রয়ে গেছে। রাস্তার গর্ত, নিকাশি, অপরিষ্কার ড্রেন, সরকারি স্কুলের ভাঙা ছাদ, সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ, আদালত ও বিচারিক ভবনের পরিকাঠামোগত সমস্যা—এসবের কতটা সমাধান হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, এগুলির অনেকটাই আগের মতো পড়ে রয়েছে, অথচ সরকার জাতীয় রাজনীতির বড় প্রশ্নগুলিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

এখানে বিজেপির নির্বাচনী সাফল্যের প্রকৃতি নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। হাওড়া বা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোট বৃদ্ধিকে শুধুমাত্র বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের সাংগঠনিক সাফল্য হিসেবে দেখার সঙ্গে একমত নন দলের সমালোচকেরা। তাঁদের বক্তব্য, তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ, SIR-কে ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যবস্থাপনা-সহ একাধিক কারণে ভোটারের একটি অংশ TMC-কে প্রত্যাখ্যান করে বিজেপির দিকে গিয়েছিল। অর্থাৎ বিজেপির ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল negative vote, সরাসরি BJP cadre-driven mandate নয়—এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ রয়েছে।

কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক বড় নেতাকে ‘জাতীয় স্বার্থে’ নিজেদের দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন অভিযোগও বিরোধীদের পক্ষ থেকে উঠছে। ফলে যে ভোটার তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: যাঁদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধিতা করে ভোট দেওয়া হয়েছিল, তাঁদেরই যদি পরে বিজেপির রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা দেওয়া হয়, তাহলে পরিবর্তনের অর্থ কী?

হাওড়ার ক্ষেত্রে এখন তাই রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে উন্নয়নের প্রশ্নটি সরাসরি যুক্ত হয়েছে। সরকার যদি সত্যিই শিল্প পুনরুজ্জীবন চায়, তাহলে তাকে বলতে হবে কোথায় শিল্প হবে, কত জমি প্রয়োজন, জমি কীভাবে পাওয়া যাবে, কোন শিল্প আসবে, কত কর্মসংস্থান হবে এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে বলতে হবে, সেই শিল্প সংক্রান্ত সম্ভাব্য হাজার হাজার কোটি টাকার জমি ও অবকাঠামো মামলায় সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই করবে কারা।

একশো দিন কোনও সরকারের পূর্ণ মেয়াদের বিচার করার জন্য যথেষ্ট নয়—এ কথা ঠিক। কিন্তু একশো দিন অন্তত সরকারের দিকনির্দেশ বোঝার জন্য যথেষ্ট। হাওড়ার ক্ষেত্রে এখনও সেই দিকনির্দেশ স্পষ্ট নয় বলেই অভিযোগ। শিল্প নেই, পুরনো শিল্পভূমির ব্যবহার বদলে গেছে, নতুন manufacturing hub-এর বাস্তব পরিকল্পনা প্রকাশ্যে নেই, বড় শিল্পের জন্য জমি সংগ্রহের রূপরেখা নেই এবং একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মামলার জন্য নিয়োজিত আইনজীবীদের যোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তাই হাওড়ার মানুষের প্রশ্ন এখন খুব সরল: বিজেপি সরকার কি সত্যিই হাওড়াকে আবার শিল্পনগরী করতে চায়, নাকি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ এবং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেনেসাঁ’ শুধু নির্বাচনী ভাষণেই থাকবে? আর যদি শিল্প আসে, বড় জমি অধিগ্রহণের মামলা, পুরসভা ও পঞ্চায়েতের বিরোধ, সরকারি প্রকল্পের litigation এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়ে সরকারের স্বার্থ রক্ষা করবে কে—সেই প্রশ্নের উত্তরও সরকারকেই দিতে হবে।